সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ‘ফেব্রুয়ারিতে হরতাল ও আন্দোলনের গুজব বিষয়ক জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ শীর্ষক একটি বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে, এটি আসল নয় বলে নিশ্চিত করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, শেখ হাসিনা এমন কোনো বিবৃতি দেননি এবং এটি পুরোপুরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রচারিত বিবৃতিটিতে অসংখ্য অসঙ্গতি রয়েছে, যা এটি ভুয়া বলে প্রমাণ করে। প্রথমত, বিবৃতিটির ভাষাগত গঠন সন্দেহজনক। এতে হিন্দি ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ দেখা গেছে, যা শেখ হাসিনার মতো একজন শীর্ষ নেতার সরকারি বিবৃতিতে থাকা সম্ভব নয়। উপরন্তু, বিবৃতিতে ভারতের জাতীয় প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে, যা আরও সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিবৃতিতে ভারতের প্রতীক থাকবে?

এছাড়াও, এই কথিত বিবৃতিতে শেখ হাসিনার নাম হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা হয়েছে, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। শেখ হাসিনা যদি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতেন, তবে তা নিঃসন্দেহে শুদ্ধ বাংলা ভাষায় এবং নির্ভুল আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রকাশ করা হতো। অথচ প্রচারিত বিবৃতিটি কেবলমাত্র বানান ও ভাষাগত ভুলেই নয়, বরং কাঠামোগতভাবেও সন্দেহজনক।
আরেকটি বড় অসঙ্গতি হলো, বিবৃতিটিতে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয়েছে। কিন্তু দলটির পক্ষ থেকে কিংবা কোনো গণমাধ্যমে এমন কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের অফিসিয়াল পেজ হ্যাক হলে সেটি নিশ্চিতভাবেই সংবাদ শিরোনাম হতো। অথচ, নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যম বা আওয়ামী লীগের কোনো দায়িত্বশীল নেতা এ ধরনের তথ্য নিশ্চিত করেননি। এটি স্পষ্ট যে, জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করার জন্যই এই ভুয়া বিবৃতি ছড়ানো হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি ও প্রচারিত ভুয়া বিবৃতির মধ্যে কোনো মিল নেই। গত ২৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ঘোষণা দেয়, তারা ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি লিফলেট বিতরণ, ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ মিছিল, ১০ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিল, ১৬ ফেব্রুয়ারি অবরোধ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি সারাদেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অথচ, ভুয়া বিবৃতিটিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বার্তা প্রচার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে একটি চক্র রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে চায়। তারা গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ভুল বার্তা প্রচারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুজব ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে, এবং এক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই ভুয়া বিবৃতিটি প্রচার করার পেছনে কারা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের। গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টা রুখতে জনগণকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি, তথ্য যাচাই না করে বিভ্রান্তিকর কিছু শেয়ার না করার জন্য নাগরিকদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ফ্যাক্ট-চেকিং ও গুজব শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা হলে এমন প্রচারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। তাই, ভুয়া সংবাদ বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের শিকার না হয়ে, যেকোনো তথ্য যাচাই করার পরই বিশ্বাস ও শেয়ার করা উচিত।