শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেপ্টেম্বর মাসে মোট ২৪০ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৮ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার সমান। এটি দেশের ইতিহাসে একক মাসে রেকর্ড করা তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।
সাধারণত ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার মতো বড় উৎসবের আগে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়। তবে এবারে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় কোনো উৎসব ছাড়া এত বিপুল পরিমাণে প্রবাসী আয় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। পরবর্তীতে চলতি বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৩ কোটি ৮৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকার পতন এবং তার দেশত্যাগের পর দেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে আসে। সে সময় অনেক ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের টাকা চাহিদা অনুযায়ী ফেরত দিতে অক্ষম ছিল। নতুন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় প্রবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র উল্টো কথা বলছে। বরং তারা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মন্তব্য করেন, ‘রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি নতুন বাংলাদেশের সূচক। প্রবাসীরা দেশের গণ-অভ্যুত্থানকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ এখন তাদের, এবং এ দেশ গঠনে তাদের অবদান রাখা উচিত।’
প্রবাসীদের এই উৎসাহ বজায় রাখতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যদি দেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবেন। অন্যদিকে, দেশ বিপথে গেলে তারা হতাশ হতে পারেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য সেবার মান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রবাসীরা যদি তাদের প্রাপ্য সম্মান পান, তাহলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকবে।’
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আবহে ৫ আগস্ট সরকারপ্রধানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও দেশ ছাড়েন। এক বছর আগে তার নেয়া কিছু সিদ্ধান্তের ফলে দেশে বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। ওই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে মাত্র ১৩৩ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর গত মাসে ২৪০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ১০৭ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রবাসীরা ৬ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর মানে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্সে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষস্থান দখলে রেখেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটি সেপ্টেম্বরে ৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এনেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, যেখান থেকে এসেছে ৩২ কোটি ২১ লাখ ডলার। তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে ট্রাস্ট ব্যাংক, যার মাধ্যমে গত মাসে ২৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, ‘প্রবাসীরা দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে উদগ্রীব ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সেটির প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের সর্বাধিক রেমিট্যান্স আহরণ করে আসছে। প্রবাসীদের দৃঢ় আস্থার কারণে আমরা এখনও সেই অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছি। আশা করছি, আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে।’
বাংলাদেশীদের জন্য প্রধান শ্রমবাজার হলো সৌদি আরব, যেখানে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। তবে গত দুই বছরে বেশি প্রবাসী আয় আসছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। বর্তমানে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় স্থানে সৌদি আরব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স ২০২০-২১ অর্থবছরে এসেছে। করোনাভাইরাস-সৃষ্ট দুর্যোগের ওই বছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠান। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। যদি বাকি সময়েও এই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকে, তাহলে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড হবে।