সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন
দিন যত এগোচ্ছে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশার মাত্রা ততই বাড়ছে। তাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁদের অবস্থা এখন এমন যে, আর কোনো পথ খোলা নেই। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আশায় তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে গিয়ে সমাধান খুঁজছেন। ব্যবসা ও অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যবসায়ীরা সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না বলেই দাবি করছেন। এ কারণে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কাছে তাঁরা নয়টি দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিক্রয় কমেছে, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। প্রয়োজনমতো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না, আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৬৬ শতাংশে।
নতুন গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন পণ্যের ওপর কর ও মূসক বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ীরা ‘এক্সিট পলিসি’ দাবি করেছেন এবং এজন্য একটি সার্কুলার জারি করারও আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহৎ শিল্পখাতের জন্য ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে এক বছরের মনিটরিয়ামসহ ১২ বছরের শোধ মেয়াদ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে এক বছরের মনিটরিয়ামসহ ১৫ বছরের সময়সীমার দাবি জানিয়েছেন। ঋণ পরিশোধে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও অনুরোধ করেছেন তাঁরা।
রবিবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের একটি দল গভর্নরের কাছে এসব দাবি উত্থাপন করেন। ব্যবসায়ীরা ঋণ খেলাপির মেয়াদ তিন মাসের পরিবর্তে ছয় থেকে নয় মাস করার দাবি জানিয়েছেন। বড় শিল্পখাতের ঋণের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের শোধ সময়সীমা চেয়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের জন্য ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের সময় চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া, সিঙ্গেল কোম্পানির সিঙ্গেল আইডেনটিটি নীতিমালা বাস্তবায়নেরও দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ অব কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হলে সেটিকে গ্রুপ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো কোম্পানি গ্রুপ হিসেবে নিবন্ধিত না হলেও যদি কয়েকজন পরিচালক কমন থাকেন, তবে সেটিকে গ্রুপ হিসেবে ধরা হয়। এর ফলে একজন পরিচালক কোম্পানি ছেড়ে গেলেও অন্যত্র যদি কোনো সমস্যা হয়, তবে তিনি দায় বহন করতে বাধ্য হন। এই বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রণোদনার অর্থ দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রদানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। গভর্নরকে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট শেষ হতে নয় থেকে ১২ মাস লেগে যায় এবং অর্থ ছাড় হতে আরও আট থেকে ১২ মাস সময় লাগে। ব্যাংকের সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার ফান্ডেড ১৫ এবং ননফান্ডেড ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, টাকার অবমূল্যায়নকে আমলে নেওয়া হচ্ছে না এবং এটিকে আগের মতো ২৫ শতাংশে রাখা উচিত। ঋণ খেলাপির ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। মার্চ থেকে কেউ যদি তিন মাস কিস্তি পরিশোধ না করেন, তাহলে তাঁকে খেলাপি ঘোষণা করা হবে। তাই এ মেয়াদ ছয় মাসে বাড়ানোর প্রস্তাব জানিয়েছেন।
বর্তমানে ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য এই হার কমানো অথবা আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সিএমএসই খাত বর্তমানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। এই খাতকে রক্ষা করতে বিশেষ তহবিল এবং নিম্ন সুদের হারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে একটি জেলা বা ক্লাস্টার নির্ধারণ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু আমি মনে করি, এতে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে। ৭০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকেই যান না। সুদহার বাড়ালে কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমবে? বরং এতে খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। আমাদের কাঁচামাল, মেশিনারি এবং জ্বালানি সবই আমদানি করতে হয়। ফলে বিনিয়োগ নতুন করে হওয়া প্রায় অসম্ভব।’
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক বলেন, ‘সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমরা অত্যন্ত হতাশ। বিশেষ করে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাড়ানোর ফলে আমাদের ব্যবসা এবং জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গভর্নর বলেছেন, ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠানকে করপোরেটাইজ করতে। এটি একটি ভালো দিক, কিন্তু এত দ্রুত তা সম্ভব নয়। ঋণ খেলাপির মেয়াদ ৯০ দিনের পরিবর্তে ১৮০ দিন করার প্রস্তাব নিয়ে গভর্নর বলেছেন, বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে। তবে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আইএমএফের পরামর্শে ঋণ খেলাপির মেয়াদ কমানো হয়েছে। ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে গভর্নর বলেছেন, এটি বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি।’
সূত্র: বিডি প্রতিদিন