শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:২৫ পূর্বাহ্ন
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন সম্মানের সঙ্গে নিশ্চিত করাসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছেন আহতরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের সঙ্গে এক বৈঠকে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের একটি প্রতিনিধিদল এ দাবি জানায়। দাবিগুলো বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি ডিসেম্বরের মধ্যেই দাবিদাওয়া পূরণ শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আহতদের চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পেলে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. মো. সায়েদুর রহমান।
এ ছাড়া ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম, আন্দোলনে শহীদ মুগ্ধর যমজ ভাই ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বৈঠকে অংশ নেন। এ ছাড়া শতাধিক আহত ছাত্র-জনতা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আহতরা সাত দফা দাবি তুলে ধরেন।
তাঁদের দাবিগুলো হলো, গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের দ্রুত মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা আহত হলে যে মানের চিকিৎসা পেতেন, সেই মানের চিকিৎসা দিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানে আহত হয়ে যারা নিজ খরচে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের চিকিৎসা খরচ পরিশোধ করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সম্মাননা কার্ডের মাধ্যমে একটি প্রজন্ম পর্যন্ত মাসিক ভাতা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের স্মৃতি ফাউন্ডেশন নামে জাদুঘর নির্মাণ করে প্রতিবছর ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শহীদদের স্মরণে গণস্বাক্ষর কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ও আহত হয়ে যারা অঙ্গ হারিয়েছেন, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের মেডিক্যাল ফাইল পরীক্ষা করে কোনো ডাক্তার বা মেডিক্যালের অবহেলার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করে সেই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। আগামী দিনে রাষ্ট্র সংস্কারে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, আজকের (গতকাল) বৈঠকে কতগুলো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে যারা গণ-অভ্যুত্থানে আহত হয়েছেন, তাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি বিভিন্ন ফাউন্ডেশনসহ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উদ্যোগগুলো সমন্বয় করে আহত যোদ্ধাদের আমৃত্যু সম্মানের সঙ্গে সব ধরনের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি আহত যোদ্ধার একটি ইউনিক আইডি কার্ড থাকবে। কার্ডধারীদের সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সব সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তারা সারা জীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন। ইতিমধ্যেই আহতরা চিকিৎসায় যে খরচ করেছেন তা প্রমাণ সাপেক্ষে ফেরত দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘যারা অন্ধ হয়েছেন তারা সারা জীবন কীভাবে চলবেন, সে জন্য তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পঙ্গুদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা যেমন দ্রুত ফিজিওথেরাপি বা প্রয়োজনীয় যন্ত্র দেওয়া হবে। আলোচনায় এসেছে যে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রোবোটিক চিকিৎসা ও উন্নত যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে যারা মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন তাদের টেলিমেডিসিনের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা হবে এবং প্রয়োজনে সাইকোথেরাপি দেওয়া হবে। দেশের আটটি বিভাগে একটি করে সেন্টার থাকবে, সেখান থেকে এই সেবা দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ১৭ নভেম্বরের পর একটি সাপোর্ট সেন্টার চালু করা হবে। সেখানে ৫ আগস্টের আগে যারা এই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে এবং অভিযোগের সমাধান করা হবে। এছাড়া সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আহতদের জন্য ডেডিকেটেড বেড থাকবে। বিশেষ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঢাকার দিকে আসতে হবে। ঢাকার সব হাসপাতালকে একটি নেটওয়ার্কে আনা হবে, কোন হাসপাতালে সিট খালি আছে তা জানা যাবে। আমরা আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা দিতে চাই। যেসব সেবা দেশে পাওয়া সম্ভব নয়, তাদের বিদেশে নিয়ে সেই সেবা নিশ্চিত করা হবে। এই প্রক্রিয়াগুলো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। কোনো কিছুতে তিন দিন, পাঁচ দিন বা ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। তবে আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে সব দৃশ্যমান হবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত কার্যকর হবে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহ্য করা হবে না এবং অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যারা আন্দোলনে আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের নিয়ে কাজ করা রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক কর্তব্য।’
তিনি বলেন, ‘এটি কোনো সরকারি নির্দেশনার বিষয় নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর শহীদ ও আহতদের পাশে থাকা তাদের নৈতিক কর্তব্য। সর্বোপরি এটি আমাদের জাতীয় দায়িত্ব, যেন কেউ অবহেলা না করে। বর্তমান সরকারই তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে। এই বিশ্বাস আমাদের সকলের রয়েছে। তারা সেটাই বারবার চাইছে। কারণ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক আলাপ অনেক সময় সবার মধ্যে অনাস্থা তৈরি করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যে একটি টাইমলাইন দেওয়া হয়েছে, আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে একটি রূপরেখা দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে।’