বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০৭:২৯ পূর্বাহ্ন
ছিলেন একজন শিক্ষক। পরে ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করেন। ব্যবসার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সুবাদে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এর পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি)। এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান।
ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। পরে সংসদ সদস্য হওয়ার পর এসব অভিযোগের মাত্রা বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি চাঁদাবাজি, জমি দখল, ঘের দখলসহ সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সাবেক এমপি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. মহিববুর রহমানের বিরুদ্ধে এই সব অভিযোগ উত্থাপন হয়েছে। এতদিন তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস করেনি।
কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এস এম রাকিবুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, “মহিববুর এমপি থাকা অবস্থায় দুর্নীতির কোনো ক্ষেত্র বাদ দেননি। টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাজই করতেন না। ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে জমি কিনেছেন। তাঁর এসব কার্যকলাপ দলের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে। দলকে তিনি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছেন।”
মহিববুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আক্তারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে পটুয়াখালী জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়ে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্পাদিত জমির দলিল ও রেকর্ডের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে মহিববুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগে পাঁচটি মামলা দায়ের হয়। এরপর থেকেই তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা পলাতক। অভিযোগ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুস্থ, অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ তিনি তাঁর পছন্দের ব্যক্তি ও দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিতরণ করেন। ২৯ আগস্ট সামাজিক মাধ্যমে একটি তালিকা প্রকাশ হয়, যেখানে দেখা যায় ১২৩ জনকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাঁর স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে এই অর্থ বরাদ্দ করেন। তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিয়ম অনুসারে এসব অর্থ আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ করার কথা।
তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বরাদ্দ পেয়েছেন ঢাকার শেওড়াপাড়ার মো. শফিউল আলম, মহিপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নুর ইসলাম, কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এ বি এম শামসুজ্জামানসহ দলের আরও অনেক নেতা।
টিআর কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত দুর্যোগ সহনীয় ঘরও মহিববুর রহমানের আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাবেক এমপি নিজে এই তালিকা তৈরি করেন।
কলাপাড়া পৌর এলাকায় পৈতৃক জমিতে নির্মাণাধীন ভবনের জন্য সরকারি খাল দখল করেছেন মহিববুর রহমান। এতে খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির নিচে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত ঢেউটিনের স্তূপ রয়েছে।
পায়রা বন্দরের কাছে একটি জমি কেনার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে এই জমি তাঁর স্ত্রীর নামে দখল করেন।
২০১৮ সালে এমপি হওয়ার পর তিনি কুয়াকাটায় জমি দখল শুরু করেন। সরকারি জমি দখলের অভিযোগে জেলা প্রশাসনের নোটিশ পাওয়া সত্ত্বেও দখল ছাড়েননি।
কুয়াকাটা অঞ্চলে জেলেদের মাছ ধরতে হলে মহিববুরের লোকজনকে চাঁদা দিতে হতো। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী এবং ঘনিষ্ঠজনরা এসব চাঁদা আদায়ের নেতৃত্ব দিতেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০১৮ সালে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে এই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। নগদ অর্থের পরিমাণও ৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।
মহিববুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা। তাঁর কর্মকাণ্ড দলের জন্য যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সূত্র: প্রথম আলো