শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন
কুষ্টিয়ায় সরকারি শিশু পরিবার (বালক) থেকে এক শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস হোসেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর স্থানে সমাজসেবা কার্যালয়ের আরেক কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল লতিফের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা দপ্তর জানায়, গত ২ নভেম্বর কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক) থেকে রাইহান হোসেন ওরফে রিজভী (১২) নামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়। এরপর ৪ নভেম্বর কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। গতকাল সন্ধ্যায় শহরের চৌড়হাস এলাকায় শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণে শিশুরা বিক্ষোভ করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ সময় জেলা প্রশাসন প্রথমবারের মতো ঘটনাটি জানতে পারে। ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক।
এরপর পুলিশ গিয়ে শিশু পরিবারে দায়িত্বে থাকা উপতত্ত্বাবধায়ক আসাদুজ্জামান ও সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়। কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিহাবুল ইসলাম জানান, গভীর রাতে সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল লতিফের জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
উপপরিচালক আবদুল লতিফ গণমাধ্যমকে জানান, ইলিয়াস হোসেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাঁর স্থানে নতুন একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্তে যাঁদের দায় পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এত বড় ঘটনা ঘটলেও তাঁকে আগে জানানো হয়নি। ৬ নভেম্বর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি একে দায়িত্ব অবহেলা বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, এটি সঠিকভাবে করা হয়নি।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমাকেও বিষয়টি জানানো হয়নি। ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে, তাঁরা কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা, যিনি হারানো ফুফাতো ভাইয়ের খোঁজে কুষ্টিয়ায় এসেছেন, বলেন, ২ নভেম্বর তাঁর ভাই নিখোঁজ হলেও তারা তা জানতে পারেন ৪ নভেম্বর। একই দিনে রাইহানের ব্যাগ খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় শিশু পরিবার প্রাঙ্গণে সকল শিশু বিক্ষোভ করে। এ সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিক্ষোভে শিশুরা বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরে। উপতত্ত্বাবধায়ক আসাদুজ্জামান জানান, ২ নভেম্বর রাইহান ও নাহিদ নামে দুই শিক্ষার্থী প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে যায়। তাদের সন্ধান না পেয়ে ৪ নভেম্বর থানায় জিডি করা হয়।
সহকারী তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। যদিও তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন, তিনি স্বীকার করেন যে, নাহিদকে সত্য জানার জন্য মারধর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নাহিদ যেহেতু রাইহানের সঙ্গে ছিল এবং পরে ফিরে এসেছে, তাই সত্য জানার জন্য মারধর করা হয়েছে। এ জন্য আমি একা দায়ী নই।’
এক শিক্ষার্থী জানান, ‘এখানে আমাদের প্রচণ্ড মারধর করা হয়। আমাদের পেটভরে খেতে দেওয়া হয় না। কিছু বললেই হুমকি দেওয়া হয়।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল ওয়াদুদ গণমাধ্যমকে বলেন, বিক্ষোভের বিষয়টি জানার পরপরই সেখানে যাওয়া হয় এবং কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানান, রাইহান এবং আরেক শিশু ২ নভেম্বর ট্রেনে ঢাকায় যায়। পরে তারা কমলাপুরে রাতযাপন করে। ৩ নভেম্বর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে কুষ্টিয়ায় ফেরে। নাহিদ কুষ্টিয়ায় নেমে আসে, কিন্তু রাইহান খুলনায় যায় এবং ট্রেনে ব্যাগ রেখে নেমে পড়ে। এরপর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, শিশুটির বন্ধু নাহিদের সঙ্গে কয়েকবার কথা বলার পর জানা যায়, ইলিয়াসসহ কয়েকজন তাকে তিন দফায় মারধর করেন, যাতে সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মুরাদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, শিশুদের মারধর করা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সঠিকভাবে তদন্ত করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।