সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৫৯ অপরাহ্ন
নাক, কান ও গলা—মানবদেহের এই তিনটি অঙ্গ দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। শ্বাস-প্রশ্বাস, কথা বলা, শ্রবণ ক্ষমতা কিংবা খাদ্য গ্রহণ—সবকিছুর সঠিক কার্যক্রম এই অঙ্গগুলোর ওপর নির্ভরশীল। সামান্য অবহেলা বা ভুল জীবনযাপনের কারণে নাক-কান-গলায় দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সচেতনতা ও কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এসব সমস্যার বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
১. কান পরিষ্কারে সাবধানতা জরুরি
কটন বাড বা ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে কান পরিষ্কার করা বিপজ্জনক। এতে কানের ভেতরে সংক্রমণ হতে পারে কিংবা কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কানের ময়লা বা ওয়াক্স স্বাভাবিকভাবেই উপকারী, যা কানের ভেতরকে জীবাণু ও ধুলাবালি থেকে সুরক্ষা দেয় এবং সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই বের হয়ে আসে। গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে কানের বাইরের অংশ পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট।
২. উচ্চস্বরে কথা বলা পরিহার করুন
দীর্ঘ সময় জোরে কথা বলা বা চিৎকার করলে কণ্ঠনালিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে ভোকাল কর্ডে নোডিউল, পলিপ বা কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের পেশাগত কারণে বেশি কথা বলতে হয়, তাদের কণ্ঠের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. সুপারি, জর্দা ও গুল বর্জন করুন
সুপারি ও তামাকজাত দ্রব্য মুখগহ্বর ও গলার ক্যানসারের প্রধান কারণগুলোর একটি। নিয়মিত ব্যবহারে মুখ, জিহ্বা ও গলার মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সুস্থ থাকতে এসব অভ্যাস সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা প্রয়োজন।
৪. উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার নয়
দীর্ঘক্ষণ উচ্চ আওয়াজে হেডফোন ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে এবং অকাল বধিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়। ৬০-৬০ নিয়ম মেনে চলুন—ভলিউম ৬০ শতাংশের বেশি নয় এবং একটানা ব্যবহার ৬০ মিনিটের বেশি নয়।
৫. ধূমপান পরিহার করুন
ধূমপান নাক-কান-গলাসহ শরীরের নানা অঙ্গে ক্যানসারের বড় কারণ। এটি কণ্ঠনালি, শ্বাসনালি ও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। সুস্থ জীবনের জন্য ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা জরুরি।
৬. নাকের হাড় বাঁকা হলে কী করবেন
অনেক মানুষের নাকের মাঝের হাড় সামান্য বাঁকা বা নাকের ভেতরের মাংস কিছুটা বড় থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। শ্বাস নিতে কষ্ট, ঘন সাইনাস সংক্রমণ, দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকা বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া না হলে অপারেশন প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন নাকের ড্রপ ব্যবহার করাও ক্ষতিকর।
৭. টনসিল হলেই অপারেশন নয়
টনসিলের সংক্রমণ নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি না হলে অস্ত্রোপচারের দরকার পড়ে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক ও নিয়মিত ওষুধে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে। কুসুম গরম পানিতে গড়গড়া ও ঠান্ডা খাবার পরিহার উপকারী।
৮. কবিরাজি চিকিৎসা থেকে সতর্ক থাকুন
নাকের সমস্যায় অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নাকের ভেতরে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। নাকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, পর্দায় ছিদ্র সৃষ্টি বা ভেতরের দেয়াল একত্রে লেগে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। ‘অপারেশন ছাড়া স্থায়ী সমাধান’—এ ধরনের বিজ্ঞাপন থেকে দূরে থাকুন।
৯. অ্যালার্জিক রাইনাইটিসে নিয়মিত চিকিৎসা জরুরি
বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা চুলকানো অবহেলা করা ঠিক নয়। ধূলাবালি, ঠান্ডা, কিছু খাবার ও নির্দিষ্ট গন্ধ অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা নিন।
১০. ঘাড়ে ফোলা বা চাকা হলে করণীয়
ঘাড় বা গলায় কোনো ফোলা ব্যথাহীন হলেও অবহেলা করা উচিত নয়। এটি লিম্ফ গ্রন্থির সংক্রমণ, টিবি, টিউমার বা থাইরয়েডজনিত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসাই সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।
নাক-কান-গলার সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও ঠান্ডা এড়িয়ে চলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা বিভাগ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট