বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন
প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতা, জবাব চাইছে রাষ্ট্র—শুরু নতুন বিতর্কের!
অনলাইন ডেস্ক
তথ্য উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেছেন, সাংবাদিকদের যেমন প্রশ্ন করার অধিকার আছে, তেমনি তাদেরও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
রোববার (০৪ মে) রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত ‘ব্রেভ নিউ বাংলাদেশ : রিফর্ম রোডম্যাপ ফর প্রেস ফ্রিডম’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইউনেসকো ঢাকা অফিস, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সুইডেন দূতাবাস যৌথভাবে আয়োজন করে এই সেমিনার, যা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
মাহফুজ আলম বলেন, “আমরা যদি সংসদ সদস্য, বিচারক, গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রশ্ন করতে পারি, তাহলে সাংবাদিকদেরও প্রশ্নের বাইরে রাখা উচিত নয়। সংবাদমাধ্যমে রাজনীতির অনুপ্রবেশের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিজেরাই।”
তিনি বলেন, “স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের সময়ের গণমাধ্যমের ভূমিকা খতিয়ে দেখার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। আজকের মিডিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের জন্য যেসব সুরক্ষা আইন করা হয়েছে, তা যাতে শুধু কাগজে-কলমে না থাকে, তার বাস্তবায়নে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদ সংস্থাগুলোকে একীভূত করে একটি জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা গড়ার পক্ষে আমি। বিজ্ঞাপনদানে স্বচ্ছতা আনতে মূল্য নির্ধারণ ও লাইসেন্স নীতিমালায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে।”
তথ্য উপদেষ্টা জানান, ডিএফপি’র সঙ্গে গঠিত একটি টাস্কফোর্স এ নিয়ে কাজ করছে। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রকে কর দেয় না, এমন পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
মূল প্রবন্ধে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, “সাংবাদিকরা এখনো অপমান, হুমকি ও এমনকি হত্যা মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো গণতান্ত্রিক দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায্য মজুরি এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারবে না।”
তিনি বলেন, “বলা হচ্ছে, গণমাধ্যমকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দেড় ডজনেরও বেশি মিডিয়া হাউস লাভজনক। অর্থাৎ, কাঠামোগত পরিবর্তন অসম্ভব নয়।”
তাঁর মতে, এখন দেশে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সংবাদমাধ্যম আছে, যেগুলোর টিকে থাকা নির্ভর করছে রাজনৈতিক আশ্রয় কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আর্থিক সহযোগিতার ওপর। পাঠক হারালেও তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে বিজ্ঞাপনদানে অস্বাভাবিক ছাড় দিয়ে পুরো খাতের ক্ষতি করছে।
তিনি বলেন, “মিডিয়ায় এখন সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়ছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা হুমকি ও মব-ভায়োলেন্স। এগুলো ঠেকাতে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।”
ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস বলেন, “অনলাইন বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা দমনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার সম্ভব। এখনো সাংবাদিকরা খোলামেলা প্রতিবেদন করতে পারছেন না, নিজেই বিষয় বেছে নিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে নারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাকস্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের নয়—জনগণেরও অধিকার। সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ মানেই নাগরিকের কণ্ঠ স্তব্ধ করা।”
নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)-এর সভাপতি ও টাইমস মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ বলেন, “মধ্যবর্তী সরকারের সময় আমরা ১৬ ধাপ এগিয়েছিলাম। কিন্তু রাজনীতিক সরকার এলেই যদি ৩২ ধাপ পিছিয়ে যাই, তাহলে সেটা বড় দুর্ভাগ্য হবে।”
তিনি বলেন, “প্রেস কাউন্সিল একেবারেই অকেজো, সরকারের ইচ্ছানির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান। একজন সাংবাদিক অপরাধ করলে তার বিচার হোক, কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে কারাগারে মৃত্যু—এটা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। মুশতাক আহমেদ কেন মারা গেলেন, কেউ প্রশ্ন তোলে না।”
নোয়াব সভাপতির ভাষায়, “নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক সরকারই আসবে, কিন্তু মুক্ত সাংবাদিকতা কি থাকবে? ১৬ শতাংশ অগ্রগতি যেন ৩২ শতাংশ পেছনে না যায়—তার নিশ্চয়তা কে দেবে?”
তিনি আরও বলেন, “সিক্রেট এজেন্সিগুলো সরাসরি সংবাদে হস্তক্ষেপ করছে। মফস্বল সাংবাদিকেরা আতঙ্কের মধ্যে কাজ করেন। সমকালের দুই সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কী ভয়াবহ বাস্তবতায় তারা দিন কাটান।”
সেমিনারে এএফপির ব্যুরো চিফ শেখ সাবিহা আলম, বিজেসির চেয়ারম্যান রেজয়ানুল হক রাজা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।