সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ন
উন্নয়নের আলোর অপেক্ষায় জহুরুল নগর পশ্চিম জনপদ!
মো: শফিউল আলম লিমন
বগুড়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চল, এক সময় যা ছিল একটি শান্ত জনপদ, আজ তা এক ঘনবসতিপূর্ণ সম্প্রসারিত এলাকায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সাথে তাল মিলিয়ে আসেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান ও বাজারের অভাব – এই সকল সমস্যা এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দার দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের আলো বঞ্চিত এই এলাকা এখন মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিতও।
সম্প্রতি জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চলের উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিউল আলম সরকার লিমন সহ এলাকাবাসী এক যৌথ বিবৃতিতে তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। তারা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
উন্নয়ন কমিটির সভাপতি জনাব মোহাম্মদ আবু তাহের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চল শহরের প্রাণকেন্দ্রের এত কাছে হয়েও এই এলাকাটি যেন উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিতও, উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও নেই। প্রধান সড়কগুলো ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা। বৃষ্টির সময় রাস্তায় হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি গাড়ি ঢুকতে পারে না। ছোট খাটো দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।” তিনি আরও যোগ করেন, “ড্রেনেজ ব্যবস্থা এতটাই অনুন্নত যে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে, যা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ায়।
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিউল আলম সরকার লিমন সাহেব বলেন, “শহরের এত কাছে হয়েও আমরা যেন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমাদের রাস্তাঘাটের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আসতে চায় না। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা ডুবে যায়। রাত হলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। ছিনতাই, চুরি এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রশাসন কি আমাদের কথা শুনবে না? একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এখন সময়ের দাবি। আমাদের এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নেই। ফলে ছোটও ছোটও শিশুদের অনেক দূরে হেঁটে স্কুলে যেতে হয়, যা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ঈদগাহ মাঠের অভাবে ঈদের নামাজ আদায় করতেও আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া, মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কবরস্থান নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য আমাদের দূরবর্তী বাজারে যেতে হয়, যা সময়ের অপচয় এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মজনু পাইকার ও মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিক বলেন, “আমাদের এলাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, রিকশা-ভ্যান চলাচল করতে চায় না। অনেক সময় রোগী বা অসুস্থ মানুষকে কাঁধে করে মূল সড়কে নিয়ে যেতে হয়। এ যেন মধ্যযুগের জীবনযাপন!
গৃহিণী সুরাইয়া আকতার ঝিনুক ও মমতাজ বর্ষা বলেন, “বৃষ্টির দিনে ঘরের বাইরে বের হওয়া যায় না। একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে যায়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। মশাবাহিত রোগের ভয় তো আছেই।”
তরুণ শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, বলেন, “আমাদের এলাকায় খেলার কোনো মাঠ নেই। বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষা গ্রহণও কঠিন। এই অবহেলিত পরিবেশে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত।”
জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চল উন্নয়ন কমিটি এবং এলাকাবাসী সম্মিলিত ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে বেশ কিছু দাবী তুলে ধরেছেন। দাবী গুলোর মধ্যে রয়েছে,
জহুরুলনগর পশ্চিম অঞ্চলের সকল ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট দ্রুত সংস্কার ও আরসিসি ঢালা্কই-র্পেটিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
ড্রেন নির্মাণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরনে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এলাকার শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ঈদগাহ মাঠ এবং কবরস্থান নির্মাণ করতে হবে।
এলাকার বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের জন্য একটি সুবিধাজনক স্থানে বাজার স্থাপন করতে হবে।
অত্র এলাকার পাশেই সরকারী আযিযুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ফলে এই এলাকায় প্রায়ই ছাত্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি নিরাপত্তার ঘাটতিতে স্থানীয় বাসিন্দারাও পড়ছেন উদ্বেগে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করতে ও সন্ত্রাস, ছিনতাই রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহনের পাশাপাশি একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। একটি সুসংগঠিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করতে হবে, যাতে ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে রাখা না হয়। নাগরিকদের অংশগ্রহণে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
এলাকাবাসী মনে করেন, বগুড়া পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চলের এই দুর্দশাগ্রস্ত চিত্রটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। এবং উল্লেখিত সমস্যা গুলোর সমাধান হলে, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা আধুনিক নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী। এই অবহেলিত জনপদের উন্নয়নে, জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। একটি উন্নত ও নিরাপদ জহুরুল নগর পশ্চিম অঞ্চল গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই