শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ অপরাহ্ন
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২৩৫ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও শত শত মানুষ আটকে রয়েছেন এবং বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলভারো জানান, নিহতদের অনেকেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান, আবার কেউ চিকিৎসা শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর কারাকাস থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ১৯০০ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামো এই ভূমিকম্পে আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একের পর এক আফটারশকের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, অন্তত ১ হাজার ৫২০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৫০টির বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে আটটি হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলা রেড ক্রসের সদর দপ্তর এবং ফরাসি দূতাবাসও রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো বলেন, শুধু লা গুয়াইরা রাজ্যেই প্রায় ৭০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজধানীর পাশের উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানেই দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এলাকাটিকে ‘বিপর্যয় অঞ্চল’ ঘোষণা করেছেন।
তিনি জানান, উদ্ধারকাজে গতি আনতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কারাকাস বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দিন-রাত উদ্ধার অভিযান চালালেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা প্রত্যাশিত গতিতে পৌঁছাচ্ছে না।
লা গুয়াইরার বাসিন্দা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ জানান, তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে একটি ধসে পড়া সাততলা ভবনের নিচে আটকা রয়েছে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজে বিলম্ব হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন এবং কারাকাস-লা গুয়াইরা মহাসড়ক দিয়ে পানি, খাদ্য ও ওষুধ দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছেন।
ভূমিকম্পের সময় সরকারি ছুটি থাকায় অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে ছিলেন। কম্পন শুরু হতেই তারা আতঙ্কে ঘর ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
৬৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী পেড্রো পেরেজ জানান, তিনি বাড়ি ও ব্যবসা—দুটিই হারিয়েছেন। বর্তমানে পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
কারাবোবো রাজ্যের মোরন শহরেও বহু ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছেন।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, হতাহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। বিরোধী নেতাদের পরিচালিত একটি নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকাভুক্ত ওয়েবসাইটে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল দ্রুত ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।
যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করেছে এবং ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য যুদ্ধজাহাজ, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, উদ্ধারকারী দল পাঠানোর পাশাপাশি কারাকাস বিমানবন্দর সচল করতে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের ত্রাণ প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে এবং এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
এদিকে পোপ লিও চতুর্দশ প্রাথমিকভাবে এক লাখ ইউরো সহায়তা পাঠিয়েছেন। সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, মেক্সিকো, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও ইরানও উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তেল শিল্পে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, তাদের তেল অবকাঠামো নিরাপদ রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এনডিটিভি, এবিসি নিউজ