সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০১:০২ পূর্বাহ্ন
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না—তোমার পরীক্ষা চলছে।
অনলাইন ডেস্ক
সচ্ছলতা ও দারিদ্র্য পৃথিবীর সমাজ জীবনে চিরায়ত বাস্তবতা। মহান আল্লাহর দেওয়া রিজিক কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খরচ করেন, আবার কেউ সেই সম্পদের অহংকারে আল্লাহকে ভুলে যান। এ দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, জানমাল ও ফলফলাদির ঘাটতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সূরা বাকারা: ১৫৫)। তাই দারিদ্র্য যখন আসে, তখন ধৈর্যের সাথে তা গ্রহণ করতে হয়। কারণ প্রকৃত সচ্ছলতা ধৈর্য ও পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুলে নিহিত। ধৈর্যের সঙ্গে যারা দারিদ্র্য মোকাবিলা করে, আল্লাহ তাদের বলেন, ‘যারা কষ্ট, সংকট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধরে, তারাই মুত্তাকি ও সত্যবাদী।’ (সূরা বাকারা: ১৭৭)
দারিদ্র্য হতাশার নাম নয়। কিন্তু আজ সমাজে এমন পরিস্থিতি, যেখানে দরিদ্ররা কেবল অপমান আর অবহেলার শিকার। সামান্য অভাব পড়লেই শয়তান হতাশার ছবি আঁকে হৃদয়ে, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। কেউ কেউ আফসোস করে, কেন সে ধনী নয়? অথচ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ তোমাদের উপর আগেরদের মতো বিপদ আসেনি? এমন সময় তারা বলেছিল, কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।’ (সূরা বাকারা: ২১৪)
শয়তান দরিদ্রতার ভয় দেখায়, কিন্তু আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন।’ (সূরা বাকারা: ২৬৮)। তিনিই অভাব দেন, তিনিই প্রাচুর্য ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সূরা ইনশিরাহ: ৬)
আল্লাহ বলেন, ‘দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই রিজিক দিই তোমাদের ও তাদের।’ (সূরা আন’আম: ১৫১)। অর্থাৎ, রিজিকের মালিক আল্লাহ; তাই ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সমাজ দরিদ্রদের তাচ্ছিল্য করে। যেন দরিদ্র মানেই সমাজের বোঝা। রমজানে দানের সময় তাদের হেয় করা হয়, সারিতে দাঁড় করিয়ে অপমানজনকভাবে জিনিসপত্র বিতরণ করে।
যাকাত, সদকা ও দান দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক। ধনীদের উচিত তাদের সম্পদ থেকে নির্ধারিত হারে যাকাত আদায় করে তা গোপনে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা। দরিদ্রদের সহায়তা করা, তাদের খোঁজখবর রাখা, অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো এবং সম্মানজনক ব্যবহার করা জরুরি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে সদকা দাও, তবে তা ভালো। গোপনে দরিদ্রদের দিলে তা তোমাদের জন্য আরও ভালো এবং গুনাহ মোচনের উপায়।’ (সূরা বাকারা: ২৭১)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ (আদাবুল মুফরাদ: ১১২)
সুতরাং, আমাদের আশেপাশের দরিদ্র প্রতিবেশীদের সাহায্য করাই আমাদের কর্তব্য। আর যদি কেউ দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়, তবে তার করণীয় হলো: আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি, ইস্তেগফার ও দোয়া করা, ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, পাপকাজ বর্জন এবং সাহসের সঙ্গে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাওয়া। কারণ, যত বিপদেই থাকি না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই। তিনি বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সূরা জুমার: ৫৩)
পরকালের জন্য দারিদ্র্য হতে পারে সওয়াবের বাহন। যে দরিদ্র ধৈর্য ধরে, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে বললেন, ধনীরা তো ধন-সম্পদ দিয়ে হজ, দান ইত্যাদি করে জান্নাতে অগ্রগামী হচ্ছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি দরিদ্রদের বলো, ধৈর্য রাখলে এবং সওয়াবের আশা করলে, তারা জান্নাতে এমন পুরস্কার পাবে যা ধনীদের নেই। যেমন, ইয়াকুত পাথরের অট্টালিকা, যেখানে দরিদ্র নবী, শহীদ ও মুমিনরাই প্রবেশ করবে; ধনীরা নয়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে ধনীদের চেয়ে ৫০০ বছর আগে।’ (তাম্বিহুল গাফেলিন: পৃষ্ঠা ৯৯)
তাই যারা ধনী, তাদের উচিত দরিদ্রদের ভালোবাসা, কারণ দরিদ্রদের ভালোবাসা মানেই আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা। এমনকি রাসুল (সা.)-কে আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, যেন তিনি দরিদ্র সাহাবিদের নিজের মজলিস থেকে দূরে না সরান। আয়াতে এসেছে, ‘তাদের তাড়িয়ে দিও না, যারা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় তাঁর ইবাদত করে। না তাদের হিসাব তোমার দায়িত্বে, না তোমার হিসাব তাদের দায়িত্বে।’ (সূরা আন’আম: ৫২)
অনেক দরিদ্র মানুষ আল্লাহর এত প্রিয়, তাদের দোয়া আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘এমন গরিব মানুষ আছেন, যাদের চেহারা মলিন, পোশাক ধূলিমলিন, যাদের ঘরের দরজাও কেউ খোলে না; কিন্তু তারা যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তা পূর্ণ করেন।’ (মুসলিম: ৬৫৭৬)। তাই, দরিদ্রদের অবহেলা নয়, তাদের সম্মান করুন, ভালোবাসুন। কারণ তারা হতে পারে আল্লাহর প্রিয়জন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই বোধ দান করুন।
লেখক: ইমাম ও খতিব