রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১২:৫২ অপরাহ্ন
দেশি কফিতে সুইস ঘ্রাণ! নেসলে নয়, এখন বাজার কাঁপাচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ড—চাষও ছড়াচ্ছে পাহাড় পেরিয়ে মফস্বলে
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের কফির বাজারে নতুন জোয়ার, দেশি উদ্যোক্তা ও চাষে বাড়ছে প্রবৃদ্ধি
এক দশক আগেও কফি মানেই ছিল বিদেশি প্যাকেট আর নাম সুনে চুমুক দেওয়া। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেসলে ছিল প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। তবে সময় বদলেছে। কফি এখন শুধু এলিট হোটেল বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে সীমাবদ্ধ নয়—এটা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজ উৎপাদন, চাষ আর ক্যাফে কালচারের হাত ধরে, তরুণদের প্রতিদিনের জীবনে।
নেসলে ১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কফি বাজারজাত শুরু করলেও বাজার অনেক বছর স্থবির ছিল। কিন্তু ২০১০-এর পরবর্তী দশক থেকে ইনস্ট্যান্ট কফির পাশাপাশি এসপ্রেসো, ক্যাপুচিনো, ফ্লেভারড কফি—নানারকম স্বাদের কফি তরুণদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেয়। কফিশপ, কফি টু গো ও হোম কফি বানানোর প্রযুক্তি জনপ্রিয় হতে থাকে।
এই প্রবণতা ধরেই বড় বড় দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী ঝাঁপিয়ে পড়ে কফির বাজারে। তাদের মধ্যে অন্যতম আবুল খায়ের গ্রুপ, যারা ‘আমা’ ব্র্যান্ডে মাত্র চার বছরেই বাজারের দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। গত অর্থবছরে তারা আমদানি করেছে ১ লাখ ৫৯ হাজার কেজি কফি, যা বাজারের ১১ শতাংশ দখল করে। অন্যদিকে, প্রাণ-আরএফএল ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে ৯ শতাংশ বাজার দখল করে ফেলেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দেশে ১৪ লাখ ৩৯ হাজার কেজি কফি আমদানি হয়েছে। এর ৪৭ শতাংশ এককভাবে করেছে নেসলে বাংলাদেশ। তবে নতুনদের আগমন এবং প্রবৃদ্ধি দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই একচেটিয়া আধিপত্য আর থাকছে না।
শুধু আমদানি নয়, এখন চাষেও নেমে পড়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। কফির সম্ভাবনা বুঝে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক চাষ।
যদিও এখনো ৯০ শতাংশ পরিবারে চা পান হয়, কিন্তু কফির ভক্ত সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন যেমন রয়েছে, তেমনি আছে হ্যান্ড কফি গ্রাইন্ডার আর ইনস্ট্যান্ট কফির প্যাকেট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কফির বাজারে এই পরিবর্তন সাময়িক নয়—বরং ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবেই কফিময়।
দেশি কফির সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও কফি চাষ হচ্ছে। এখন টাঙ্গাইল, রংপুর, নীলফামারী-সহ অনেক জেলায় কফি চাষ বাণিজ্যিকভাবে হচ্ছে।
২০২০–২১ সালে যেখানে মাত্র ১২২ হেক্টর জমিতে কফি চাষ হতো, ২০২৩–২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১,৮০০ হেক্টর! মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কফি উৎপাদন হয়েছে ৬২ টন থেকে ৬৭ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আশা, পরবর্তী তিন–চার বছরে তা ৫০০ টন ছাড়িয়ে যাবে। আর দশ বছর পর তা গিয়ে ঠেকবে ২,০০০ টনে!
অবশ্যই। কিন্তু কফি গাছের পূর্ণ ফলন আসতে পাঁচ থেকে ছয় বছর সময় লাগে। সে অনুযায়ী ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে দেশীয় কফি উৎপাদনে বড় ব্রেকথ্রু আসতে পারে। পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কফি চাষে বিনিয়োগও শুরু করেছে।
তবে কফির আমদানি গত বছর কমেছে ১৭ শতাংশ, যার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির (৩০% পর্যন্ত) ও দেশীয় শুল্ক হার বৃদ্ধি। এতে কিছুটা কমেছে কফি পানের হার, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন—এটা সাময়িক।
বাংলাদেশের কফির বাজার এখন আর শুধু সুগন্ধী বীনের গল্প নয়—এটা হয়ে উঠছে তরুণদের স্টাইল, উদ্যোক্তাদের সুযোগ, আর দেশীয় কৃষির এক নতুন দিগন্ত। এক দশক আগেও যা ছিল বিলাসিতা, এখন তা হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার বাস্তবতা। কফির কাপে ভেসে যাচ্ছে নতুন স্বপ্ন।