মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৩২ অপরাহ্ন
মালয়েশিয়ায় বৈধ শ্রমিক পাঠাতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অগ্রগতি!
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নিরাপদ অভিবাসন, স্বচ্ছ কর্মসংস্থান এবং শ্রমবাজার সংক্রান্ত তৃতীয় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে শুরু হয়েছে।
বুধবার (২১ মে) হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের সরকার প্রতিনিধি দলের মধ্যকার আলোচনা ইতিমধ্যেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় নতুন করে শ্রমিক প্রেরণের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার মালয়েশিয়া থেকে আসা মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ড. এম. শাহরিন বিন উমরের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল ঢাকায় পৌঁছায়। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত ড. লুৎফি সিদ্দিকি এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। আলোচনা শেষে উভয় দেশের সরকারের মধ্যে শ্রমিক পাঠানো সংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হবে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া আগামী ছয় বছরে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বৈঠকের উদ্বোধনী শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ড. লুৎফি সিদ্দিকি জানান, গত বছর বাজার বন্ধ হওয়ার কারণে যেসব কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেননি, সেই প্রায় আট হাজার শ্রমিককে এবার সরকার ‘বোয়েসেল’-এর মাধ্যমে পাঠাবে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকার তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক নিতে আগ্রহী, যদিও বাংলাদেশে প্রচুর এজেন্সি রয়েছে। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনায় স্বচ্ছতা বজায় রেখে একটি নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া চালুর বিষয়েই গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালুর বিষয়ে দেশটির সরকার ইতোমধ্যেই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছে বলে জানান তিনি। মালয়েশিয়া এখন আগের চেয়ে বেশি আন্তরিকভাবে কর্মী নেয়ার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ, যা দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, অবৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর কারণে অনেকেই মালয়েশিয়ায় গোপনে বসবাস করতে বাধ্য হন, যার ফলে গ্রেপ্তার, মামলা ও কারাদণ্ডের শিকার হন। এতে দুই দেশেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তাই এই বৈঠকে বৈধ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, ১৪ মে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রীদের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, ড. লুৎফি সিদ্দিকি, সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া এবং উপসচিব সারোয়ার আলম।
সেই বৈঠকে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিআইডির দায়ের করা মানব পাচার ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়েছে। তাদের মতে, এসব মামলা “হয়রানিমূলক” এবং তা মালয়েশিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বায়রার সাবেক মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সুলভ খরচে বিদেশ যাত্রা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে কে ব্যবসা করলো সেটা বড় বিষয় নয়, বরং দেশের স্বার্থটাই মুখ্য।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সংগঠনের অনেক সদস্য হয়রানিমূলক মামলার শিকার হয়েছেন। এসব মামলা দ্রুত প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করা না হলে কেউই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।”
বায়রার আরেক নেতা মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, “পুরোপুরি বৈধ পন্থায় শ্রমিক পাঠানো সত্ত্বেও মানব পাচারের অভিযোগ দুঃখজনক ও ভিত্তিহীন। এতে শুধু শ্রমবাজার নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তাই এসব মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা অত্যাবশ্যক।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বায়রা নেতা বলেন, “প্রতিবার যখন সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করে, তখনই একটি দুর্নীতিপরায়ণ চক্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই গোষ্ঠী অবৈধ শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে লাভবান হয় এবং বৈধ প্রক্রিয়া চালু হলে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে।”
তাঁরা আরও বলেন, “অবৈধ পথে শ্রমিক পাঠালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার মালয়েশিয়ারও আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্মানহানি হয় এবং তাদের পণ্য রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তাই উভয় দেশের স্বার্থে এই অনৈতিক প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।”