মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৩১ অপরাহ্ন
৪৩ অস্ট্রেলীয় এমপির কড়া বার্তা—রোডম্যাপ দিন এখনই!
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি এক কড়া ও জরুরি বার্তা পাঠিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টের ৪৩ জন প্রভাবশালী সিনেটর ও এমপি। গতকাল বুধবার (২১ মে) পাঠানো এই চিঠিতে তাঁরা বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন ইস্যুতে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন।
তিনটি স্পষ্ট ও জ্বলন্ত দাবি উঠে এসেছে এই চিঠিতে— অবিলম্বে নির্ধারিত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা, জুলাই বিপ্লবের সময় নিপীড়িতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করা।
চিঠিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে— এসব ইস্যুতে বিলম্ব কিংবা ধোঁয়াশা জনগণের মধ্যে হতাশা আরও বাড়াবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে তুলবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন মুহূর্তে মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করছে। তাই তারা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন নির্ভীক ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই চিঠি ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. রাশেদুল হক। এ সংক্রান্ত একটি কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে।
চিঠিতে লেখা রয়েছে— “আমরা, অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচিত সিনেটর ও সংসদ সদস্যরা, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পক্ষে আমাদের দৃঢ় অবস্থান জানাতে চাই। এই লক্ষ্য অর্জনে একটি সময়সীমাবদ্ধ নির্বাচনী রোডম্যাপ, জুলাইয়ের ঘটনার শিকারদের ন্যায়বিচার এবং র্যাবের ভুক্তভোগীদের সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য আপনার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।”
অস্ট্রেলীয় এমপি ও সিনেটররা বলেন, “গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের জনগণ যে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ দেখিয়েছে, তা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই বিপ্লব অন্তর্বর্তী সরকারকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বিরল সুযোগ দিয়েছে— যেটি হাতছাড়া করলে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে।”
তাঁরা আরও বলেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রয়োজন। বিগত তিনটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং জনআস্থার অভাব স্পষ্ট ছিল। তাই সময় এসেছে নির্বাচন নিয়ে একটি স্পষ্ট কৌশল ঘোষণার— যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করবে এবং সব রাজনৈতিক শক্তিকে সমান সুযোগ দেবে।”
ড. ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, “আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে গণতন্ত্রের এক শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র ও নাগরিকদের আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, তবে তার জন্য যে মানবিক মূল্য দিতে হয়েছে, তা মর্মান্তিক।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “গত এক দশকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু আহত বা গুম হয়েছেন।”
অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি কমিউনিটির তরফ থেকে আসা দাবির ভিত্তিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়, “রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্যও ক্ষতিপূরণ ও সত্য উদঘাটনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হোক।”
র্যাব বিলুপ্তির প্রসঙ্গে চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়— “এই বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। ২০০৯ সাল থেকে র্যাবের হাতে ২,৬৯৯ জন নিহত হয়েছেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে। তারা কার্যত দায়মুক্তি নিয়ে কাজ করে এসেছে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করেছে।”
তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা অস্ট্রেলীয় সরকারকে অনুরোধ করছি, র্যাব নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে। একইসঙ্গে বাংলাদেশি জনগণের পক্ষ থেকে এই বাহিনী বিলুপ্ত এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জোর দাবি করছি।”
সবশেষে অস্ট্রেলিয়ান এমপি ও সিনেটররা বলেন— “বাংলাদেশে একটি সময়সীমাবদ্ধ, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচনই এখন গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ। তাই আপনার সরকার অবিলম্বে ও জনসমক্ষে একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করুক।”
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিনেটর লারিসা ওয়াটার্স, ডেভিড শোব্রিজ, জর্ডন স্টিল-জন, ফাতিমা পেম্যান, লিডিয়া থর্প, পেনি অলম্যান-পেইন, মেহরিন ফারুকি, স্টেফ হজগিন্স-মে, বারবারা পোকক, পিটার হুইশ-উইলসন, ডোরিন্ডা কক্স, নিক ম্যাককিম, সারা হ্যানসন-ইয়ংসহ ৪৩ জন এমপি ও সিনেটর।