রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন
বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এরপরও ডিজিটাল সেবা, দুর্নীতি কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ও আইসিটি সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে।
আইসিটি বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫৩টি প্রকল্প ও ৩৪টি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে ২২টি প্রকল্প এখনো চলমান। সব প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যেমন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
আইসিটি বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। ‘সম্ভাবনা’র কথা বলে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও সেগুলো তেমন কাজে আসেনি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। প্রশিক্ষণের নামে শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও তেমন সুফল মেলেনি।
অতিরিক্ত ব্যয়, ঘনিষ্ঠদের কাজ দেওয়া, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে আইসিটি প্রকল্পগুলোতে।
অনেকে বলছেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও তার সহযোগীরা অনেক প্রকল্প মাথায় আসা মাত্র সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতেন। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নাম ব্যবহার করে ১১টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল অনুমোদনের সুবিধার্থে।
আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতে নিয়ন্ত্রক ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থেকে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
২০২২ সালে সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে লিখেছিলেন, আইসিটি খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে গেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক দেশ বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম, যেখানে ভারত ৯৭, শ্রীলঙ্কা ৯৮ ও মালদ্বীপ ৯৪ নম্বরে। পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৬।
আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ৩৯% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান ও ভিয়েতনাম এগিয়ে আছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার বাংলাদেশে ৫২%, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম।
ইন্টারনেটের গতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং ফ্রিল্যান্সিংয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনায় ৩ সেপ্টেম্বর উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতে ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, জনগণ প্রকৃত সুফল পায়নি, বরং অনিয়ম হয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ: রূপকল্প থেকে প্রকল্প
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প ঘোষণা করে। ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের উদ্দেশ্যে প্রকল্প গ্রহণ শুরু হয়।
সৈয়দ আবুল হোসেন (ডিসেম্বর ২০১১-জুলাই ২০১২), মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ (সেপ্টেম্বর ২০১২-জানুয়ারি ২০১৪), এবং আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (জানুয়ারি-অক্টোবর ২০১৪) আইসিটি মন্ত্রী ছিলেন।
২০১৪ সাল থেকে টানা ১০ বছর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। তার বিরুদ্ধে যথেচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি।
আওয়ামী লীগ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের স্লোগান দিয়েছিল, কিন্তু তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল, ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পূর্ণ না করেই নতুন স্লোগান কেন।
অবকাঠামোর ‘গালগল্প’
জেলায় জেলায় হাইটেক ও সফটওয়্যার পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বিনিয়োগ প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন তা বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের নামে লুটপাট
২০০৯ থেকে আইসিটি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, ভাষা প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল লিটারেসি প্রশিক্ষণের নামে প্রকল্প চলেছে।
অভিযোগ আছে, প্রশিক্ষণের কাজ ঘনিষ্ঠদের দেওয়া হতো এবং সঠিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
যেমন, ২০১৪ সালে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পে ৩২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
আইএমইডির জরিপে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের অর্ধেক বলেছে, প্রশিক্ষণের মেয়াদ যথেষ্ট নয়।
অকার্যকর অ্যাপ
মোবাইল গেমস, অ্যাপস তৈরি ও প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত একই উদ্দেশ্যে আরও ৩৩০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ৬০০টি অ্যাপের একটিও কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
অনেক সময় একই উদ্দেশ্যে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হতো। যেমন, স্টার্টআপদের সহায়তার জন্য আইডিয়া প্রকল্প চলেছে।