বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস পালানোর পথ নিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের আগেই। আর শেখ হাসিনা খবর পাওয়া মাত্রই পাড়ি জমিয়েছেন। ৫ আগস্ট বিকেলে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলামও গা ঢাকা দিয়েছেন। দুই মেয়রই সিটি করপোরেশনের অন্যান্য দুর্নীতির পাশাপাশি মশক নিধনে বরাদ্দকৃত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এতে নগরবাসী নিয়মিত কর প্রদান করলেও মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না।
এডিস মশার তাণ্ডবে রাজধানীর জনজীবন অতিষ্ঠ। প্রতিদিনই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন মানুষ। গতকালও তিনজন মারা গেছেন এই রোগে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে মোট ১৯৯ জনের, আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০,৪০৫ জন। দুই মেয়র পলাতক থাকায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ মেয়রদের প্রস্থান হলেও এডিস মশার প্রকোপ কমেনি। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তবে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বৃষ্টির পরপরই মশার বংশবৃদ্ধি বেড়ে যায়। অথচ দুই সিটি করপোরেশন মশা নিধনে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করলেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা দেখা যায় না। দুর্নীতির জালে আটকে যায় মশা নিধনের উদ্যোগ।
২০১২ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল নগর সেবার মানোন্নয়ন লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে নাগরিক দুর্ভোগ বেড়েছে। এডিস মশার প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। অথচ দুই সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা এখন নিষ্ক্রিয়। মশা নিধনের নামে শত কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে মশার উপদ্রব কমছে না। শেষ হাসিনা সরকারের আমলে দুই সিটি করপোরেশন মশা মারতে হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও ঢাকায় মশার উৎপাত রয়ে গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ১১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এ খাতে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। ডিএনসিসি চলতি অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৮৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬১ শতাংশ বেশি। সব মিলিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের ব্যয়িত টাকার অংক বিশাল হলেও মশার উপদ্রব কমছে না।
কীটনাশক ক্রয়ের পাশাপাশি মশক নিধনের জন্য ড্রেনে তেলাপিয়া মাছ, গাপ্পি মাছ, হাঁস ও ব্যাঙ ছাড়া হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। তবু এই বিপুল অর্থ খরচ করেও কার্যকর কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। নগরবাসী প্রতিদিন এডিস মশার আক্রমণে ভুগছে, হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীতে পরিপূর্ণ। তেলাপিয়া মাছ বা বিটিআই নামক মশা নিধনের ওষুধ নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএনসিসি মশক নিয়ন্ত্রণে ১১৪ কোটি টাকা খরচ করেছে, আর ডিএসসিসি ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। তারপরও সঠিক পদক্ষেপের অভাবে নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো অগ্রগতি নেই। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অক্টোবরে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাগরিকরা সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
জুলাই মাসে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২,৬৬৯ জন এবং ১২ জনের মৃত্যু হয়। আগস্টে আক্রান্ত হয় ৬,৫২১ জন এবং মৃত্যু হয় ২৭ জনের। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮,৯৭ জন এবং ৮০ জন মারা যান। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বিশেষভাবে দেখা গেছে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।
এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গতকাল আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ১৯৯ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৮৩ জন। ঢাকার দুই সিটিতে এর মধ্যে ২৪৬ জন, বাকিরা ঢাকার বাইরের। এই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ভর্তি হয়েছেন ৪০,৪০৫ জন, যার মধ্যে ৩৬,৭১১ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৩,২১,১৭৯ জন আক্রান্ত হন এবং ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাত্রাবাড়ী, মুগদা, এবং জুরাইন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। প্রতিদিন এখান থেকে বহু রোগী চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন। মশা নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে প্রতিদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, চলতি বছর বর্ষা মৌসুমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়নি, কেবল সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক সপ্তাহব্যাপী কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন জানিয়েছেন, বিশেষ কার্যক্রমের অধীনে এক লাখ ২১ হাজার ৮৮৬টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়, যেখানে ৩৫১টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে এবং তা ধ্বংস করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও কার্যকর সাফল্য না আসায় নগরবাসী মশার কামড় থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।