রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন
মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে মানুষ ঠিক কী অনুভব করে—এই প্রশ্ন বহু যুগ ধরে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন, মৃত্যুর প্রাক্কালে মস্তিষ্কের আচরণ বুঝতে। যদিও এটি এখনো সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হয়নি, সাম্প্রতিক এক গবেষণা এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য এনেছে, যা মৃত্যুর রহস্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিং নিউরোসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা “Enhanced Interplay of Neuronal Coherence and Coupling in the Dying Human Brain” মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেছে।
গবেষকদের দাবি, মৃত্যুর সময় মস্তিষ্ক এমনভাবে সক্রিয় হয়, যেন সে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর ঝলক দেখাচ্ছে। এমন অনেকেই, যারা মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছেন, বলেছেন যে তাদের পুরো জীবন এক মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। এই রহস্যময় অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারে এই গবেষণা।
গবেষণার প্রধান গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের নিউরোসার্জন ড. আজমল জেমার জানান, ‘মৃত্যুর সময় মস্তিষ্ক এমন এক ধরনের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করে, যা সাধারণত স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি প্রায় সেই অভিজ্ঞতার মতো, যা অনেক মানুষ মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে বর্ণনা করেন।’
বিশেষত, এক ৮৭ বছর বয়সী মৃগী রোগীর মৃত্যুর সময় তার মস্তিষ্কের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করা হয়। তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় চিকিৎসকেরা তার মস্তিষ্কতরঙ্গ রেকর্ড করেন। দেখা যায়, হৃদযন্ত্র থেমে যাওয়ার আগের ৩০ সেকেন্ড এবং পরবর্তী ৩০ সেকেন্ডে মস্তিষ্ক এক ধরনের ব্যতিক্রমী তৎপরতা দেখায়।
গবেষণায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো গামা তরঙ্গের নাটকীয় বৃদ্ধি। এই তরঙ্গ সাধারণত উচ্চ-স্তরের মস্তিষ্কীয় কার্যকলাপ ও স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। এমনকি জীবনের বিভিন্ন ঘটনা দ্রুতগতিতে পুনরায় ‘খেলতে’ শুরু করে মস্তিষ্কের ভিতরে! অন্যদিকে, গভীর ঘুমের সঙ্গে যুক্ত ডেল্টা ও থিটা তরঙ্গ এবং সচেতন মনোযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত আলফা ও বিটা তরঙ্গও সক্রিয় থাকে।
এই গবেষণা মৃত্যুর সময়কাল ও সংজ্ঞা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
ড. জেমার বলেন, ‘আমরা এতদিন ধরে ধরে নিয়েছি, হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়া মানেই মৃত্যু। কিন্তু এই গবেষণা দেখায়, মস্তিষ্ক তখনো সক্রিয় থাকতে পারে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যায়। এটি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—কখন সত্যিকারের মৃত্যু ঘটে?’
এমনকি গবেষণার এই ফলাফল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের সঠিক সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কেননা, হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার পরেও মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকতে পারে, যা মানবদেহের মৃত্যুর সময় নির্ধারণের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবারও বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। গবেষকরা মনে করছেন, এই গবেষণা ভবিষ্যতে আরও গভীর অনুসন্ধানের পথ খুলে দেবে এবং মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে সহায়ক হবে।
মৃত্যুর মুহূর্তে মস্তিষ্ক কি শেষবারের মতো বিদায় জানায়? নাকি এটি এক নতুন দিগন্তের সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা চালিয়ে যাবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!