রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ন
ঘোড়ার ডিম, চানাচুর আর কেক—পুরান ঢাকার ইউসুফ বেকারিতে একবার না গেলে জীবনের স্বাদই মিস
অনলাইন ডেস্ক
চনমনে পুরান ঢাকার সরু গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই এক অচেনা তৃষ্ণা তাড়া করল। জনসন রোডে গলা ভেজাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক ছোট্ট দোকানে। বাইরে থেকে একদমই চোখে পড়ে না, কিন্তু ভিতরে ঢুকলেই মনে হবে যেন স্বাদের রাজ্যে ঢুকে পড়েছি! দোকানটির নাম ‘ইউসুফ কনফেকশনারী’, কিন্তু এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ‘ইউসুফ বেকারি’ নামে। আর এই ছোট দোকানই ধরে রেখেছে পুরান ঢাকার ৯০ বছরের ঐতিহ্য।
ইউসুফ বেকারির যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৯ সালে, মোহাম্মদ ইউসুফ নামে এক তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে। তাঁর নানা আবদুল ব্যাপারীর কেক-বিস্কুটের ব্যবসার সূত্রেই বেকারির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। রায়সাহেব বাজার থেকে যাত্রা শুরু করে বেকারিটি বর্তমানে জনসন রোডের ১৯/এ নম্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছে গর্বের সঙ্গে। বংশাল, কোর্ট-কাছারি আর ব্যবসায়িক মানুষদের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে এটি দ্রুতই।
বর্তমানে মোহাম্মদ ইউসুফের ১১ ছেলের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ১২টি শাখা—পুরান ঢাকা থেকে গুলশান, রামপুরা পর্যন্ত। তবে খাবারের স্বাদ যাতে এক থাকেই, তার জন্য সব খাবার এখনো পুরান ঢাকার জজ কোর্টের পেছনে অবস্থিত একটি কারখানাতেই তৈরি হয়।
ছোট্ট দোকানের একপাশে কাচের আলমারিতে সারি সারি প্যাটিস, বার্গার, রোল আর কেক। অন্য পাশে ক্লাসিক বেকারি আইটেম—বিস্কুট, পাউরুটি, নিমকি। দাম একেবারে সাধ্যের মধ্যেই—বিস্কুট ৩৮০-৪০০ টাকা কেজি, চানাচুর ৩০০ টাকা কেজি, প্যাটিস ৪০–৬০ টাকা, কেক পাউন্ডপ্রতি ১৯০–৩০০ টাকা।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার—তৎক্ষণাৎ বানিয়ে দেওয়া চানাচুর! ১১টি উপকরণ, আলাদা বয়ামে সাজানো। চাইলেই নিজের পছন্দমতো উপাদান বাড়িয়ে-কমিয়ে বানিয়ে নেওয়া যায়। আকাশ নামের দোকান কর্মী জানালেন, এর জন্যও আছে আলাদা কারখানা!
শবে বরাত বা রমজান এলেই ইউসুফ বেকারিতে যুক্ত হয় বিশেষ মেনু। মাছ আকৃতির ফ্যান্সি রুটি, সুজি-বুটের হালুয়া, সুতি ও জালি কাবাব, হালিম, জিলাপি, গ্রিলড চিকেন—সবই বানানো হয় ফরমাশ অনুযায়ী।
বর্তমানে ইউসুফ বেকারির মূল শাখা দেখাশোনা করছেন প্রতিষ্ঠাতার নাতি ইশরাত জাহান ও ইয়ামিন। তাঁদের কথায়, “স্বাদ ও মানে যেন কোনো হেরফের না হয়, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” এ কারণেই প্রতিটি শাখায় খাবার সরবরাহ করা হয় একেকদিন তৈরি হওয়া তাজা পণ্যের মাধ্যমে।
আরমানিটোলার বাসিন্দা জিসান আলম বলেন, “বাসায় কেক, পাউরুটি, সব এখান থেকেই নেই।” সাবিহা নওরীন বলেন, “বাসার ছোটরা এখানকার ফাস্ট ফুড খেতে ভালোবাসে।”
এখানে পাওয়া যায় ‘ঘোড়ার ডিম’ নামের এক মজার ক্যান্ডি জাতীয় খাবার, জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। দামও মাফিক—মাত্র ৩০ টাকা! চিকেন চিপস মাত্র ৩০ টাকায়, আলু চিপস ২০ টাকায়। ক্যান্ডি হোক বা কেক, প্রতিটি আইটেমই দিনে দিনে শেষ হয়ে যায়।
শেষ কথা:
ইউসুফ বেকারি শুধু খাবারের দোকান নয়, এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য। যেখানে পুরান ঢাকার মানুষ শুধু স্বাদ নয়, বরং স্মৃতি, ইতিহাস আর আবেগ নিয়েই ফিরে আসেন বারবার। একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে করে—এটাই ইউসুফ বেকারির সত্যিকারের ‘রেসিপি টু হার্ট’।