বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন
যেখানে অন্যায়, সেখানেই নজরুল — চেতনার চিরঞ্জীব জ্যোতি!
অনলাইন ডেস্ক
আজ ২৪ মে ২০২৫, বাঙালির গৌরবময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মহারথী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। সাহসিকতা, প্রেম, সাম্য ও মানবতার এক বিস্ফোরক কণ্ঠস্বর হিসেবে যিনি কবিতার ছন্দে-ছন্দে জাগিয়ে তুলেছিলেন নিপীড়িত জনতার হৃদয়। শুধু শব্দের কারিগর নন, নজরুল ছিলেন এক বিদ্রোহী বাতিঘর, যিনি কাগজে-কলমে এক বর্ণাঢ্য বিপ্লব রচনা করেছিলেন।
“বিদ্রোহী কবি” হিসেবে খ্যাত নজরুল তাঁর অগ্নিগর্ভ লেখনীতে সমাজের অনাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে তুলেছিলেন বজ্রকণ্ঠ। মাত্র ২৩ বছরের সৃজনপর্বে তিনি যে অসাধারণ সাহিত্যভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর কলম ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ অস্ত্র, আর হৃদয় ছিল মানবতার পক্ষে এক বিশাল পৃষ্ঠপোষক।
নজরুলের কবিতা ও সংগীত আজও মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় চেতনা ও ন্যায়বিচারের প্রেরণাদায়ক প্রতীক। তিনি ছিলেন কেবল কবি নন, এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধ্বজাবাহী — আমাদের জাতিসত্তার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
জন্ম ও শৈশবকাল
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ), পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন নজরুল ইসলাম। পিতা কাজী ফকির আহম্মদ ও মাতা জাহেদা খাতুনের ঘরে জন্ম নেওয়া নজরুলের জীবন ছিল কঠিন বাস্তবতার নির্মম পাঠশালা। শৈশবে বাবার মৃত্যু এবং পরিবারের দারিদ্র্য তাঁকে অনেক আগেই জীবন সংগ্রামে নামিয়ে দেয়। লেটো গানের দলে ও মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করতে করতে সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
সৈনিক থেকে সাহিত্যিক
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে নজরুল ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করেন। সৈনিকজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাধারায় নতুন মাত্রা যোগ করে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি আরবি, ফারসি ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে আরও পরিপক্ব করেন।
যুদ্ধ ফেরত নজরুল সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত হন। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা, যার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তাঁকে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত করে “বিদ্রোহী কবি” হিসেবে।
সাহিত্য ও চিন্তার জাগরণ
নজরুলের সাহিত্য একটি মহাবিপ্লব — তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে। বিদ্রোহী, নিস্পৃহ, বৈরাগী, মানুষ — এসব কবিতায় ফুটে ওঠে বঞ্চিতের আর্তনাদ ও মুক্তির স্পষ্ট প্রত্যয়। তাঁর লেখা বার্তা দেয়, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণি নির্বিশেষে সকল মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী।
নজরুল নারীর মর্যাদা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জোরালো পক্ষপাতিত্ব করতেন। তাঁর ‘নজরুলগীতি’ বাংলা সংগীত জগতে এক মহৎ সংযোজন — ইসলামি হামদ-নাত থেকে শুরু করে হিন্দু ভক্তিগীতি পর্যন্ত সবই স্থান পেয়েছে তাঁর সুরে।
সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে দৃপ্ত পদচারণা
সাহিত্য ছাড়াও নজরুল সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের জগতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ছাপ। ধূমকেতু, নবযুগ, কিরণ প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি ছিলেন সম্পাদক ও লেখক। ব্রিটিশবিরোধী অবস্থানের কারণে একাধিকবার জেলও খেটেছেন, যা তাঁর সাহিত্যকে আরও বলিষ্ঠ করেছে।
তিনি ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন এবং ‘পাতালপুরী’, ‘নন্দিনী’ প্রভৃতি সিনেমায় গীতিকার ও সুরকার হিসেবে যুক্ত হন। তাঁর চলচ্চিত্রে সামাজিক বার্তা ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়।
অসুস্থতা ও প্রতিফলনের সময়
১৯৪২ সালে এক রহস্যময় স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন নজরুল, ফলে বাকশক্তি হারান এবং ধীরে ধীরে সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্যোগে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিতে ভূষিত করে।
চিরবিদায় ও চিরস্মৃতি
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় পিজি হাসপাতালে মৃত্যু হয় নজরুলের। তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে, যেখানে তিনি আজও জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিখর হিসেবে বিরাজ করছেন।
প্রাপ্ত সম্মান ও চিরস্থায়ী প্রভাব
কাজী নজরুল ইসলাম পেয়েছেন একুশে পদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট, এবং স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা। তবে তাঁর প্রকৃত পুরস্কার — বাঙালি হৃদয়ে অমলিন ভালোবাসা।
নজরুল ছিলেন বিদ্রোহের কবি, তবে শুধু বিদ্রোহী নন — তিনি প্রেম, মানবতা ও সত্যের কবি। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনন ও সংস্কৃতিকে যে প্রগাঢ়তায় পৌঁছে দিয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য ধন ও চিরজাগরুক দীপশিখা।