সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন
গোপন ঈমানের সাহসিকতা, ফিরআউনের রাজ্যে সত্যের জ্বলন্ত দীপ!
অনলাইন ডেস্ক
পবিত্র কোরআন মাজিদের প্রতিটি আয়াতই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক একটি হেদায়াতের আলো। বিশেষ করে ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ যখন তাওহিদের আহ্বান ও বাতিলের মুখোমুখি সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলে, তখন সেগুলোর শিক্ষাগ্রহণ আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সুরা আল-মুমিনের ২৮ নম্বর আয়াতে এমনই এক অসাধারণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে একজন গোপন মুমিন ব্যক্তি, যিনি ফিরআউনের পরিবারভুক্ত ছিলেন, সাহসিকতার সঙ্গে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার বক্তব্য, যুক্তি ও চিন্তা-ভাবনার গভীরতা কেবল এক বিশেষ গণমাধ্যমের জন্য নয়, বরং চিরন্তনভাবে আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ ٭ۖ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ ۚ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ ۖ وَإِنْ يَكُ
صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ
ফিরআউনের পরিবারের এক মুমিন ব্যক্তি, যিনি তার ঈমান গোপন রাখতেন, বললেন, তোমরা কি একজন মানুষকে হত্যা করবে শুধু এ কারণে যে সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ’? অথচ সে তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছে। যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যার ফল তার উপরেই বর্তাবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার সতর্কবাণীর কিছু অংশ তোমাদের ওপর অবশ্যই এসে পড়বে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালনা করেন না। (সুরা গাফির: ২৮)
এই আয়াতে বর্ণিত মুমিন ব্যক্তির নাম কুরআনে উল্লেখ নেই। তবে হাদিস ও ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি অনুযায়ী, অনেক মুফাসসির মতে, তার নাম ছিল শামআন এবং তিনি ফিরআউনের চাচাত ভাই ছিলেন। তার ঈমান ছিল পূর্বেই, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়ের কারণে তা গোপন রেখেছিলেন। যখন মূসা (আ.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হল, তখন তিনি আর নীরব থাকতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে এসে যুক্তিপূর্ণ ও সাহসী বক্তব্যের মাধ্যমে ফিরআউনের সমর্থকদের চেতনায় দারুণ প্রভাব ফেললেন।
একজন মানুষ কেবল তার রবকে আল্লাহ বললেই কি তাকে হত্যা করা উচিত? যদি সে মিথ্যা বলে, তার মিথ্যার ফল তো তাকে ভোগ করতে হবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার সতর্কবাণীর কোনো অংশই অবহেলা করা উচিত নয়, কারণ তা বাস্তবায়িত হবেই।
এই বক্তব্যে কেবল সাহসী মুমিনের হৃদয়কেই আমরা দেখি না, বরং সত্যের প্রতি যুক্তিনির্ভর ও দয়ালু মনোভাবের এক আলোকচ্ছটা দেখতে পাই। সেই ব্যক্তি বুঝিয়েছেন, নবী যদি সত্যবাদী হন, তবে তাকে অবহেলা করা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এই আয়াত থেকে আমাদের জন্য রয়েছে বহু গূঢ় শিক্ষা। প্রথমত, বিপদ, প্রতিকূলতা ও একাকীত্বেও সত্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। দ্বিতীয়ত, ইসলামের দাওয়াতে শুধু আবেগ নয়, যুক্তি ও বিবেচনাও অপরিহার্য। তৃতীয়ত, সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত বিচারের দায়িত্ব আল্লাহর। মুমিন কখনো অহংকারী বা সীমালঙ্ঘনকারী হতে পারে না।
আসুন, আমরা এই আয়াত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, সত্যকে চিনে সাহসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করি, অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে যুক্তির পথে রুখে দাঁড়াই এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি।