রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন
একজন স্বপ্নভাঙা কিশোর কীভাবে হয়ে উঠলেন তারকাদের প্রিয় রূপসজ্জাকর?
অনলাইন ডেস্ক
একসময় এফডিসির গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি, ভেতরে ঢোকার সাহস হতো না। বয়স মাত্র ১৩। বাবাকে হারিয়ে গ্রামের দারিদ্র্য আর ’৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা তাকে ছুড়ে দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে। সেই কিশোর মাহবুব রহমান মানিক তখনো জানতেন না, একদিন তিনিই হবেন তারকাদের নির্ভরতার আর নামের পেছনের সেই অদৃশ্য শিল্পী—একজন রূপসজ্জাকর।
ঢাকায় আসার সময় তাঁর চোখে ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা করে হয়তো কিছু একটা করবেন। গ্রামে কাঞ্চনের বাড়ি ছিল বলেই আশা জেগেছিল মনে। কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা হলেও তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন গ্রামে ফিরে গিয়ে পড়াশোনা করতে। সেই পরামর্শ মানা হয়নি। তবে হালও ছাড়েননি মাহবুব।
দিনের পর দিন ঘুরেছেন এফডিসির বাইরে। একসময় নিউমার্কেটের এক দোকানে কাজ জোটে, কিন্তু মন পড়ে থাকে সিনেমার জগতে। হঠাৎ দেখা হয় এক মামার সঙ্গে, যিনি ছিলেন প্রোডাকশন ম্যানেজার। তাঁর হাত ধরে শুরু হয় মাহবুবের রূপসজ্জার যাত্রা। কিংবদন্তি রূপসজ্জাকর আবদুল মান্নানের সহকারী হিসেবে যুক্ত হন, যিনি ছিলেন চিত্রনায়ক মান্নার মেকআপম্যান।
প্রায় পাঁচ বছর শেখার পর ১৯৯৫ সালে নিজেই প্রথমবার কাজ করার সুযোগ পান। প্রথম সাজান চম্পাকে। এরপর সুযোগ আসে মান্না প্রযোজিত লুটতরাজ চলচ্চিত্রে। সেখানে খলনায়ক রাজীবের চুলের স্টাইল তৈরির জন্য সাত দিন সময় নেন মাহবুব। রাজীব চুল দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে তাকে সম্মাননা দেন, সাথে দেন ২ হাজার টাকা। এটাই ছিল মাহবুবের আত্মবিশ্বাসের প্রথম বড় মুহূর্ত।
চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মাহবুব প্রবেশ করেন নাটকে। সেখানে তৌকীর আহমেদ, শমী কায়সার, জাহিদ হাসান, বিপাশা হায়াত—সবাই তাঁকে সঙ্গে নিতে থাকেন। নাটকের মাধ্যমে শুরু হয় বিজ্ঞাপনজগতে প্রবেশ, আফজাল হোসেনের হাত ধরে। এরপর কাজ করেছেন অমিতাভ রেজা, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মতো পরিচালকদের সঙ্গে।
মোশাররফ করিমের মাধ্যমেই পরিচয় হয় ফারুকীর সঙ্গে, আর তারপর ‘টেলিভিশন’, ‘পিঁপড়াবিদ্যা’, ‘ডুব’, ‘শনিবার বিকেল’-এ তাঁর রূপসজ্জার মুন্সিয়ানা মুগ্ধ করে সবাইকে।
তিনি বলেন, “তারকারা আমাকে ছাড়া মেকআপই করতে চান না—এটা আমার জীবনের বড় সম্মান।” তাঁর কাজের নান্দনিকতায় প্রতিবারই আনতেন নতুনত্ব, যা তাঁকে আলাদা করে তুলেছে সবার মাঝে।
২০১৬ সালে মাহবুব জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত আন্ডার কনস্ট্রাকশন–এ সেরা মেকআপম্যান হিসেবে। এটিকে তিনি বলেন জীবনের সেরা অর্জন।
তবে এত সম্মান, সফলতার মধ্যেও রয়েছে কিছু না বলা কষ্ট। তাঁর ভাষায়, “একসময় এ পেশার সম্মান ছিল, এখন সেটাও হারিয়ে গেছে। বিদেশে রূপসজ্জাকরদের সম্মান আলাদা, আমাদের দেশে সেটা কেউ বোঝে না।”
একজন কিশোর যে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে এক টুকরো স্বপ্ন আঁকড়ে ধরেছিলেন, তিনিই আজ তারকাদের আস্থার প্রতীক। কেমিস্ট্রি কিংবা কসমেটিক্স নয়, মাহবুব রহমান মানিক সাজিয়ে তুলেছেন স্বপ্ন—যেগুলোর আলোয় জ্বলে আমাদের রুপালি পর্দা।