বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনায় বসতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই। কমিশনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপিও এখন আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুত, কারণ দলটির মতে, জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর হওয়া উচিত।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সক্রিয় থেকেছে এবং এবারও তারা আলোচনায় অংশ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে চায়, যাতে তাদের বিরুদ্ধে সংস্কার প্রশ্নে কোনো নেতিবাচক প্রচারণা চালানো না যায়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনটি গঠিত হয় চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজকে সহসভাপতি করা হয়। সাত সদস্যের এই কমিশনের হাতে মূলত ছয় মাস সময় ছিল, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৫ আগস্টে। এই সময়ে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফায় সংলাপ করে মোট ৮২টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বা সিদ্ধান্ত দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার আলোচনায় অংশ নেয় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট, যেখানে ২০টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ১১টিতে সর্বসম্মতি হয় এবং বাকি ৯টিতে কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই নয়টির মধ্যে সাতটিতেই বিএনপির এবং একটিতে জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) ছিল।
এখন তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত খসড়া, কিন্তু এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। কমিশন জানিয়েছে, এ বিষয়টি বিশেষজ্ঞ মতামত ও রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা থেকেই নির্ধারিত হবে। গত সপ্তাহে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রথম ধাপের আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবে কমিশন।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট। সনদের খসড়ায় বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার দুই বছরের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে। বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হলেও জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কিছু দল মনে করছে, শুধু অঙ্গীকার থাকলেই হবে না—এটিকে অবশ্যই একটি শক্ত আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন রোডম্যাপ থাকতে হবে। বিএনপির অবস্থান এখানে কিছুটা ভিন্ন—তাদের মতে, সংবিধান সংশোধনের বাইরে যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সরকার চাইলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে যেকোনো সময় কার্যকর করতে পারে, আর সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে উত্থাপন করা উচিত।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর সংশোধনী খসড়াও আলোচিত হয়। বিএনপির নেতারা খসড়ার বেশিরভাগ পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, কারণ অনেক প্রস্তাব তাদের দাবি অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান, ভোট কারচুপির ঘটনায় পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা পুনর্বহাল, ‘না’ ভোটের সুযোগ এবং ইভিএম বাতিল—এসবকে তারা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন। এছাড়া সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। যদিও বিএনপির নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন, আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতার যেন কোনো রাজনৈতিক অপব্যবহার না হয়।
এছাড়াও বৈঠকে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস প্রসঙ্গ উঠে আসে। নির্বাচন কমিশনের নতুন সীমানা নির্ধারণ কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা বিএনপির কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান স্থানীয় পর্যায়ের নেতা এবং ক্ষুব্ধ অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন পেশ করেন। এতে আসন পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য প্রভাব, স্থানীয় অসন্তোষ এবং সমাধানপথ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিএনপির কৌশল এখন স্পষ্ট—জুলাই জাতীয় সনদের আলোচনায় সক্রিয় উপস্থিতি, সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা এবং নির্বাচনী আইন সংস্কারে ইতিবাচক সমর্থন দেখিয়ে নিজেদের একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরা। তাদের লক্ষ্য, যে কোনো সংস্কার প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার দায় যাতে তাদের কাঁধে না আসে এবং জনমতের আদালতে তারা যেন সংস্কারের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে পারে।