বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন
নারী-শিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তায় ইতিহাস গড়া শাস্তির বিধান!
অনলাইন ডেস্ক
নারী ও শিশুদের সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে সরকার। ২০২৫ সালের নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে পুরুষের তুলনায় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন হয়রানির ঘটনায় অপরাধীর জন্য দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ৯টি বিতর্কিত ধারা বাদ দিয়ে সাজানো হয়েছে নতুন অধ্যাদেশ, যেখানে কিছু দণ্ড ও মামলা একেবারেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
২১ মে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে।
অধ্যাদেশের ২৫ ধারায় উল্লেখ রয়েছে—যদি কেউ ব্ল্যাকমেইল, সাইবার যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন কিংবা ডিজিটাল শিশু নিপীড়নের মতো অপরাধে লিপ্ত হন, তাহলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে এই অপরাধের শিকার যদি হন নারী বা ১৮ বছরের নিচের শিশু, তাহলে দণ্ড হতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, “পুরুষের বিরুদ্ধে অনলাইনে হয়রানি বাড়লেও, আইনের এই সংশোধনী গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আইনটি আরও ঢেলে সাজানো যাবে।”
এ অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪ ধারা বাতিল করা হয়েছে। ফলে এসব ধারায় চলমান মামলা ও তদন্ত স্থগিত হবে এবং আর কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। একইসঙ্গে এসব ধারায় আগে দেওয়া দণ্ড-জরিমানাও বাতিল বলে গণ্য হবে।
বাদ পড়া ধারাগুলোর মধ্যে ছিল—মুক্তিযুদ্ধ বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রচারণা, পরিচয় প্রতারণা, অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, মানহানিকর তথ্য প্রচার ইত্যাদির শাস্তির বিধান। এইসব ধারাকে সংবিধান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করে বহুদিন ধরেই মানবাধিকারকর্মীরা সমালোচনা করে আসছিলেন।
নতুন অধ্যাদেশে মোট ৯টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে এর সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য, দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি, এবং চতুর্থ অধ্যায়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের নিয়মাবলি রয়েছে। এই কাউন্সিলই দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেবে।
পঞ্চম অধ্যায়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’, ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘সাইবার অপরাধ ও দণ্ড’, সপ্তম অধ্যায়ে ‘তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া’, অষ্টম অধ্যায়ে ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতা’ এবং নবম অধ্যায়ে ‘বিধি প্রণয়ন’ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
জুলাইয়ের গণআন্দোলনে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই বিতর্ক মাথায় রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার সেসব ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ নতুন অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে এবং ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে জনমত আহ্বান করে। সমালোচনার পর ধারাবাহিকভাবে ২৫ বার পরিবর্তন করে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। ৬ মে উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সেদিন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, অংশীজনদের সঙ্গে বহুবার আলোচনার মাধ্যমেই এই সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যব আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, “নারী ও শিশুরা সাইবার যৌন হয়রানির সবচেয়ে বেশি শিকার হয়, তাই তাদের বাড়তি সুরক্ষার প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে নারী-পুরুষ তুলনা করা অনুচিত।”