সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
“অন্তরের শিকড়ে ফিরছে পুরোনো দিনের আসবাব – আধুনিক ছোঁয়ায় জমজমাট নাগরিক অন্দর”
অনলাইন ডেস্ক
একবার ভাবুন তো, একটা বাসা যদি আসবাব ছাড়া হয়? জীবনটাই যেন পঙ্গু হয়ে যায়! তাই মানবসভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমানতালে এগিয়েছে আসবাবের ইতিহাসও। আগেকার দিনে মানুষের বসার জন্য ছিল পাথরের চাঁই, কাঠের গুঁড়ি। কিন্তু সেই সাদামাটা আসবাব আজ হয়ে উঠেছে রুচি আর আভিজাত্যের প্রতীক।
প্রাচীন মিসরীয়রা একেশিয়া আর সিডার কাঠ দিয়ে তৈরি করত তাদের রাজকীয় আসবাব। হাতির দাঁত, সোনা, চুনাপাথরের মিশেলে তৈরি হতো ফারাওদের রাজসিক আসবাব। গ্রিক আর রোমানদের সময়েও আসবাব হয়ে উঠেছিল স্থাপত্যের এক রূপ – জলপাই, ওক, বিচ, ম্যাপল কিংবা মার্বেলের মিশেলে তৈরি হতো আসবাব।
মধ্যযুগে আসবাব ছিল রুক্ষ, কিন্তু কার্যকর। ওকের তৈরি সিন্দুক, পায়াযুক্ত ভারী ডাইনিং টেবিল আর দীর্ঘ বেঞ্চ ছিল জনপ্রিয়। পরে রেনেসাঁ যুগে আসবাবে যুক্ত হয় নকশা, ফুলেল প্যাটার্ন আর বাইবেলের গল্পভিত্তিক কারুকার্য। সেই সময়েই জনপ্রিয় হয় মেহগনি কাঠের আসবাব।
ভিক্টোরিয়ান যুগে (১৮৩৭-১৯০১) শুরু হয় নকশা আর ঐশ্বর্যের বাহার। ভারী কাঠের সোফা, লন্ঠন, ঝাড়বাতি, সোনালি কারুকার্য, জমকালো কাপড়—এসব হয়ে ওঠে উচ্চবিত্তদের ড্রয়িংরুমের গর্ব। তখনকার আসবাবের অন্যতম মুখ্য প্রতীক হয়ে ওঠে ভিক্টোরিয়ান সোফা, যা আজও ধ্রুপদী সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বর্তমান।
বিংশ শতকে আসবাব হয়ে ওঠে হালকা, ছিমছাম, টেকসই। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রযুক্তির ছোঁয়া, থ্রিডি ডিজাইন, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্যতা। পরিবেশবান্ধব আর মিনিমালিস্টিক ডিজাইনের দিকে ঝুঁকছে আজকের নাগরিক ঘর।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে অ্যান্টিক আসবাব ফিরেছে নতুন রূপে, আধুনিক শৌখিন অন্দরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে। অ্যাস্থেটিক ইন্টেরিয়রসের প্রধান ডিজাইনার সাবিহা কুমু জানাচ্ছেন, পুরোনো দিনের সেই আভিজাত্যধর্মী আসবাব নতুন রঙ, উপকরণ ও টুইস্ট নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ফ্ল্যাটে।
ভিক্টোরিয়ান সোফা আজও উচ্চবিত্ত ঘরের কেন্দ্রবিন্দু। মখমলের কভার, স্প্যানডেক্স ফ্যাব্রিক আর রয়্যাল রঙ—যেমন অফ হোয়াইট, পাইন গ্রিন, মেরুন—সবই সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
কারুকার্যখচিত পালঙ্ক এখন শুধু খাট নয়, একধরনের স্টাইল স্টেটমেন্ট। উচ্চতায় বেশি, চারদিকে লম্বা স্ট্যান্ড। পর্দা বা নেট দিয়ে রোমান্টিক টাচও যোগ করছে অনেকে।
ঝাড়বাতি এখন শুধু রাজপ্রাসাদের বিষয় নয়—মফস্বল শহরেও পাওয়া যাচ্ছে হাজার থেকে লাখ টাকার ঝাড়বাতি। আধুনিক নাগরিকেরা স্টেটমেন্ট পিস হিসেবে বেছে নিচ্ছে এটি।
জলচৌকি এখন রান্নাঘর থেকে বারান্দা, এমনকি বাচ্চার পড়ার জায়গায়ও ব্যবহৃত হচ্ছে। সাবেকি কিন্তু ফ্যাশনেবল—এই হলো জলচৌকির জাদু।
কাঠের সিন্দুক কেবল গয়নার বাক্সই নয়, এখন এটা স্টোরেজও। আবার অনেকেই ভিন্টেজ শোভা হিসেবে ঘরের এক কোণে এটি রাখছেন।
ট্রাংক আগে যেখানে জামাকাপড় বা বই রাখার মাধ্যম ছিল, এখন সেগুলো হয়ে উঠেছে শোভা বর্ধক শোকেস। রিকশা পেইন্ট করা ট্রাংক দারুণ ট্রেন্ডি!
দেয়াল ঝোলানো আয়না – আগের মতোই লম্বা, তবে হালকা আর ফ্রেমবিহীন। দেয়ালে ঝোলানো নয়, হেলান দিয়ে রাখাও ফ্যাশন!
ইজিচেয়ার – এখন আর শুধু কর্তার জন্য নয়, পরিবারের সবার জন্য। কাঠ, স্টিল, প্লাস্টিকের মিশ্রণে তৈরি আরামদায়ক বসার জায়গা।
দোলনা – ছাদ বা বারান্দায় ঝুলে থাকা এই বসার আইটেমটা দিচ্ছে রেট্রো ফিল, রোমান্টিক মোড।
তবে শুধু আসবাব নয়, সাজসজ্জায়ও ফিরে এসেছে নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। সিরামিকের নকশা করা বাটি, কাঁসা-পিতলের বাসন, থ্রিডি প্রিন্ট আর কুরুশ কাটা কুশন, জামদানি বা গারদের রানার, ভিক্টোরিয়ান ফুলদানির মতো পুরোনো ধাঁচের জিনিসপত্রে ঘর হয়ে উঠছে আরও বৈচিত্র্যময়।
ছোট পর্দার পরিচিত মুখ শবনম ফারিয়াও নিজের ড্রেসিং টেবিল বানিয়েছেন পুরোনো কাঠের সিন্দুকের ওপর আয়না হেলান দিয়ে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য।
আসবাবের এই ফিরে আসা যেন বলছে—পুরোনো কখনো পুরোনো হয় না, সেটা সময়ের সঙ্গে বদলে নতুন হয়ে ওঠে। আর আজকের নাগরিক ঘর সেই পুরোনোকে নতুন করে বরণ করছে নিজের মতো করে।