মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রিজ থেকে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারজুড়ে চলেছে দীর্ঘ যানজট, যেখানে আটকে ছিল হাজার হাজার যানবাহন। যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর ব্রিজের দূরত্ব সাড়ে ৯ কিলোমিটার হলেও, যানজটের ধাক্কা ছড়িয়ে পড়েছে ফ্লাইওভার হয়ে গুলিস্তান, জিরো পয়েন্ট হয়ে পল্টন পর্যন্ত, যা ঢাকার জনজীবনে স্থবিরতা এনেছে। ছুটির দিনেও এই পরিস্থিতিতে অসংখ্য যাত্রী পায়ে হেঁটে রওনা দিতে বাধ্য হন। যানজটের এমন তীব্র অবস্থা নতুন নয়, বরং বর্তমান সরকারের আমলে এটি আরও অসহনীয় রূপ নিয়েছে। ঢাকা শহরে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে যানজটের হাত থেকে রেহাই মেলে। ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও এই যানজটের কারণ নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে যানবাহনের ধীরগতি ও রাস্তায় খানা খন্দকের কারণে ১০ কিলোমিটারব্যাপী যানজট সৃষ্টি হয়। তাছাড়া শারদীয় দুর্গাপূজার সময়ে যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় যানজটের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়, যার ফলে যাত্রী ও চালকরা মারাত্মক ভোগান্তির সম্মুখীন হন। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড় থেকে বন্দরের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত চট্টগ্রামমুখী লেনে ভয়াবহ যানজটের দেখা মেলে।
সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশের শিথিল অবস্থানের সুযোগে ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক ঢাকায় প্রবেশের ফলে যানজটের পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। সম্প্রতি, এসব নিষিদ্ধ যানবাহনের সংখ্যা ৬ লাখ থেকে বেড়ে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক ঢাকায় প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এর পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। নরসিংদী থেকে ঢাকায় আসা রিকশাচালক হায়দার আলী জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা তাকে ঢাকায় এসে চালানোর পরামর্শ দেন। গাজীপুর থেকে আসা ইজিবাইক চালক বাকের আলীও বলেন, ঢাকায় বাধা ছাড়া চলাচলের খবর পেয়ে তিনি এসেছেন এবং আয় ভালো হলেও যানজটের কারণে বেশি ভাড়া নিতে পারছেন না। প্রশ্ন হলো, এভাবে ঢাকায় এত রিকশা ও ইজিবাইক প্রবেশ করানোর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কিনা? গোয়েন্দারা এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি, তবে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এরকম ভয়াবহ যানজট গত দুই দশকে দেখা যায়নি। আর পুলিশ নিষিদ্ধ যানবাহন নিয়ে এত উদাসীন কেন?
পরিবহন মালিক সমিতি, সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন, রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, হঠাৎ করে নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যানজটের প্রকোপ বেড়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, প্রায় ৪ হাজার অবৈধ বাস-মিনিবাস, কয়েক লাখ বাইরের সিএনজি অটোরিকশা এবং ১২ লাখ মোটরসাইকেল। ঢাকার রাস্তায় এত বিপুল সংখ্যক যানবাহন সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নেই। সাথে পরিবহন সেক্টরের বিশৃঙ্খলা ও নিয়মের অভাবে যানজট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ছে। সরেজমিনে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের কাজলা অংশে দেখা গেছে, ফ্লাইওভারে ওঠার আগে বাসগুলো এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। ফ্লাইওভারের নিচে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বাস কাউন্টার গড়ে ওঠায় গুলিস্তান থেকে শুরু করে শনিরআখড়া, কাজলা, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধোলাইরপাড় পর্যন্ত যানজট বাড়ছে।
যানজট নিরসনে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রথমেই ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক শহরের ভেতরে কিংবা প্রধান রাস্তায় চলাচল বন্ধ করতে হবে। এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করলে যানজট কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একইসাথে অবৈধ বাস-মিনিবাস, বাইরের সিএনজি অটোরিকশা এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন বন্ধ করা উচিত। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে একদিনে ২৭ লাখ টাকারও বেশি জরিমানা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।
ডিএমপির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৬৭৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ২৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অভিযানে ১৮২টি গাড়ি ডাম্পিং ও ৫১টি গাড়ি রেকার করা হয়। রাজধানীর ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি আরও জানান, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দিনরাত কাজ করছেন।