সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন
নওগাঁয় গ্রাহকদের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বন্ধু মিতালী ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। গতকাল রবিবার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মামুনকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর আগে, শনিবার পুলিশ মামুনুর রশিদ মামুনের স্ত্রী, ভাগনি জামাই এবং প্রধান নির্বাহী (এমডি) নাজিম উদ্দিন তনুর বোন সুফাকে আটক করে।
নাজিম উদ্দিন তনু নওগাঁ শহরের জগৎসিংহপুর এলাকার বাসিন্দা। মামুনুর রশিদ মামুনের আটক সংবাদের পর আজ সোমবার দুপুরে সদর থানায় ভুক্তভোগীদের ভিড় জমে। ওসি নুরে আলম সিদ্দিকী তাদেরকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে ফেরত পাঠান।
জানা গেছে, নওগাঁ শহরের খাঁস-নওগাঁ পোষ্ট অফিস পাড়ায় কয়েক বছর ধরে বন্ধু মিতালী ফাউন্ডেশন ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। সংস্থাটি জামানতকারীদের প্রতিশ্রুত মুনাফা হিসেবে প্রতি লাখ টাকায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা প্রদান করত। এই সংস্থার ১১টি উপজেলার শাখা রয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার সদস্য যুক্ত। উচ্চ মুনাফার লোভে গ্রামাঞ্চলের শত শত সহজ-সরল মানুষ এই সংস্থায় কোটি কোটি টাকা আমানত রেখেছেন।
গত দুই মাস থেকে সংস্থাটি গ্রাহকদের মুনাফা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এমডি নাজিম উদ্দিন তনু গ্রাহকদের ডিসেম্বর মাস থেকে মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে সংস্থার সরিষাহাটির মোড়ের একটি শাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শাখা বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা আতঙ্কে পড়েন। মুনাফা না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা সেনাবাহিনীসহ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
গত অক্টোবর মাসে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এক সমাবেশে সংস্থার পরিচালকরা গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ১২ নভেম্বর রাতে সংস্থার সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে পরিচালক ও চেয়ারম্যান পালিয়ে যান। প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। গ্রাহকদের পক্ষ থেকে থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
খাঁস-নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা মোসতাক আহমেদ পাপ্পু বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারি না। কর্ম জীবনের সঞ্চিত ৫ লাখ টাকা তিন বছর আগে এ সংস্থায় রেখেছিলাম। মাসে ১০ হাজার টাকা মুনাফা পেতাম। এতে সংসারের খরচ মেটাতাম ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালাতাম। দুই মাস আগে ৫০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছিলাম। বাকি টাকা তুলতে চাইলে তনু কালক্ষেপণ করছিলেন। হঠাৎ একদিন অফিস বন্ধ করে সবাই উধাও হয়ে যায়। এখন সংসার চালাতে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’
একই এলাকার গৃহবধূ শারমিন জানান, ‘জমি বন্ধক রেখে এক বছর আগে এ সংস্থায় ৭ লাখ টাকা রেখেছিলাম। মাসে দুই হাজার টাকা মুনাফা পেতাম। কয়েকটি সংস্থা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখে টাকা তুলে নিতে চেয়েছিলাম। সংস্থাটি ডিসেম্বর মাসে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই কর্মকর্তারা পালিয়ে যান। এখন বড় দুশ্চিন্তায় আছি।’
ওসি নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সদস্যরা মামুনুর রশিদ মামুনকে আটক করে আমাদের কাছে সোপর্দ করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ তাকে আদালতে পাঠানো হবে।’
তিনি আরও জানান, ‘মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। আগে কৃষি কাজ করতেন এবং পরে এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হন। তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা নেই। তিনি কীভাবে চেয়ারম্যান হয়েছেন সেটি স্পষ্ট নয়। এমন একজন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে এত টাকা তুলে দেওয়া এবং গ্রাহকদের এমন আস্থাভাজন হওয়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য।’