শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৬:৫৫ অপরাহ্ন
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অলিউল্লাহ মোল্লা ২০১৬ সালের ১০ জুলাই পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ প্রাণ হারান। তাঁর পরিবার জানায়, সেদিন বিকেলে পুলিশ বাড়ি থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়, সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতা-কর্মীও। পরদিন সকালে অলিউল্লাহর মৃত্যুর সংবাদ পায় তাঁর পরিবার।
পুলিশ তখন দাবি করে, ওই দিন রাতে মোটরসাইকেলে চলার সময় টহলরত পুলিশ তাঁকে থামার সংকেত দেয়। তিনি না থেমে পুলিশের দিকে বোমা ও গুলি ছোড়েন। পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানায় পুলিশ। পরবর্তীতে পুলিশি নথিতে এই ঘটনা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে লেখা হয় এবং অলিউল্লাহর পরিচয় দেওয়া হয় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এমন ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারের’ নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জনের বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) থেকে পাওয়া, যারা গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
মানুষ হত্যার প্রতিটি ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় একই ধরনের বক্তব্য আসে। এই ঘটনাগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে গণ্য হলেও শেখ হাসিনা সরকার ও প্রশাসন বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সংঘটিত সাত বছরের ক্রসফায়ারের তথ্য সংরক্ষণ করেছে। এই সংক্রান্ত নথি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে সম্প্রতি। এতে দেখা যায়, ওই সাত বছরে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২৯৩ জন। দেশে এমন কোনো জেলা নেই যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। অনেক নিহত ব্যক্তি রাজনৈতিক কর্মীও ছিলেন।
এসবির হিসাব অনুযায়ী, সাত বছরে ক্রসফায়ারে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা আসকের হিসাবে আরও ১২০ জন বেশি।
প্রতিটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্রসফায়ারের সাজানো গল্প বলে মামলা করে, যেখানে নিহত ব্যক্তির সহযোগী হিসেবে অন্যদেরও আসামি করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করার সাহস পায় না। কেউ কেউ আদালতে মামলা করার চেষ্টা করলে হয়রানি ও হুমকির শিকার হন।
বিএনপি নেতা অলিউল্লাহকে হত্যার পর তাঁর স্ত্রী সালিমাও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার স্বামীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও গুলি করে মারা হয়। এ নিয়ে যেন আমরা কিছু না বলি বা মামলা না করি, সে জন্য আমাদের হুমকি দেওয়া হয়। আমার স্বামীর ভাইদেরও গ্রেপ্তার করা হয়।’ সালিমা সাতক্ষীরার আদালতে গত ২৮ আগস্ট মামলাটি করেন।
লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তনের ধরন দেশে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হিসেবে অনেকে সিরাজ শিকদারের নাম উল্লেখ করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে ওই হত্যার যে বর্ণনা তৎকালীন পুলিশ দেয়, পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকার আমলেও একই ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে আসছে।
ক্রসফায়ারের ঘটনা নিয়ে ২০০৪ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের আমলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন রাজধানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই পরিস্থিতিতে সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করে। র্যাবের অভিযানে পিচ্চি হান্নানসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা শুরু হয়, যা জনসাধারণের নজর কাড়ে। একই সময়ে পুলিশও এ ধরনের ক্রসফায়ার শুরু করে।
তখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতিবাদ করলেও সরকার তা গুরুত্ব দেয়নি। সে সময় সন্ত্রাসীদের নির্মূলের কথা বলে ক্রসফায়ারকে বৈধতার মোড়ক দেওয়া হয়।
সূত্রমতে, ক্রসফায়ারের লক্ষ্যবস্তু শুরুতে ছিলেন শীর্ষ অপরাধী বা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা। পরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে এবং প্রভাবশালীদের ইন্ধনে প্রতিপক্ষকে দমন করতে এসব ঘটনা ঘটানো হয়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে ‘ক্রসফায়ার’ ব্যবহার শুরু হয় মূলত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে। এই সময়কালে জড়িত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাবিত হয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। এর বড় উদাহরণ হলো ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা। র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ ১১ জন র্যাব সদস্য স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুর হোসেনের অর্থে এই খুনগুলোতে জড়িত ছিলেন।
হত্যার পর পরিচয়ের সাজানো গল্প এসবির তালিকায় দেখা যায়, ক্রসফায়ারে নিহতদের পরিচয়ের ২৩ ধরনের তালিকা রয়েছে। অনেকের রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে, যেমন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী। তবে বেশির ভাগের পরিচয়ে লেখা হয়েছে ‘সন্ত্রাসী’, ‘মাদক কারবারি’, ‘ডাকাত’, ইত্যাদি। এসবি ২০১৭ সালের পর রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা বন্ধ করে দেয়।
উল্লেখিত সাত বছরে ৪৭৭ জনকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ডাকাত ও ছিনতাইকারী হিসেবে ৩০০ জনের পরিচয় এবং ১৪২ জনকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় ৫ জনকে বিএনপি এবং ৯ জনকে জামায়াত-শিবিরের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জলদস্যু, বনদস্যু ও দস্যু পরিচয়ে ৮৩ জন, দুষ্কৃতকারী পরিচয়ে ৩৩ জন, বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামি পরিচয়ে ১৭ জন, অন্যান্য মামলার আসামি পরিচয়ে ১৬ জন, চরমপন্থী পরিচয়ে ১৬ জন এবং অস্ত্রধারী বা বন্দুকধারী পরিচয়ে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তা ছাড়া ধর্ষক বা ধর্ষণের আসামি পরিচয়ে ৭ জন, মানব পাচারকারী পরিচয়ে ৯ জন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৬ জনকে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫২ জনের পরিচয় ক্রসফায়ার–সংক্রান্ত পুলিশের নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া পাহাড়ি বিভিন্ন সশস্ত্র দল ও সংগঠনের সদস্য হিসেবে ৬ জন, চোরাকারবারি পরিচয়ে ৩ জন এবং অপহরণকারী হিসেবে ২ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিহত এসব ব্যক্তির অনেকে নানা অপরাধে জড়িত বা মামলার আসামি ছিলেন, এটি যেমন সত্য, তেমনি এমন লোকজনও রয়েছেন যাঁরা কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলেও কোনো না কোনো তকমা দিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ২০১৮ সালে। ওই বছরের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক। তিনি টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। অথচ ক্রসফায়ারে নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে এসবির করা তালিকায় তাঁর পরিচয় দেওয়া হয় ‘মাদক ব্যবসায়ী’।
হত্যা করতে নেওয়ার সময় একরাম তাঁর মেয়েকে ফোন করেছিলেন। সেই কল কাটার আগেই একরামকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুরো সময় ফোন কলটি চালু ছিল। পরে সেই কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে একরাম ও তাঁর মেয়ের শেষ কথা, কান্না, গাড়ি থেকে নামানোর শব্দ এবং তারপর গুলির আওয়াজ মানুষের মনে গভীর নাড়া দেয়।
এ ঘটনাকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম। তিনি গত ৩১ অক্টোবর গণমাধ্যমকে বলেন, একরামকে হাত বেঁধে গুলি করে হত্যার পর র্যাব বলেছিল বন্দুকযুদ্ধে সে মারা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হওয়ার পরও রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন আয়েশা।
আয়েশা আরও জানান, ‘ক্রসফায়ারের ঘটনায় আমাদের কোনো মামলা বা জিডি করতে দেওয়া হয়নি। বরং উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আমাকে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতেও নিষেধ করেছিলেন।’
কোন এলাকায় কত হত্যা ক্রসফায়ারের পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রসফায়ার হয়েছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে ২৯১ জন নিহত হন। এরপর খুলনা বিভাগে ২৬০ জন। রাজশাহী বিভাগে ১১৬ জন, বরিশালে ২৯ জন, সিলেটে ৩৩ জন, ময়মনসিংহে ৫৮ জন এবং রংপুর বিভাগে ৪৭ জনকে বিচার ছাড়াই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এই সময়ে দেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিতেই কোনো না কোনো সময় ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্রসফায়ারের ঘটনা কক্সবাজারে, যেখানে সাত বছরে (২০১৫–২১) ২২৬ জন নিহত হয়েছেন বিভিন্ন বাহিনীর ক্রসফায়ারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়, যেখানে নিহত ১৫১ জন। তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘটনা চট্টগ্রামে, যেখানে ৭০ জন মারা গেছেন। শেরপুর, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং পঞ্চগড়ে সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে, এসব জেলায় সাত বছরে একজন করে নিহত হয়েছেন।
জড়িত কোন কোন বাহিনী এসবির নথিতে ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১ হাজার ৭টি ক্রসফায়ারের ঘটনায় ১ হাজার ২৯৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫১টি ঘটনায় পুলিশ এবং ২৯৩টিতে র্যাব যুক্ত ছিল। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জড়িত ছিল ৪৬টি ঘটনায়। ১০টি ঘটনায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ইত্যাদি বাহিনী যৌথভাবে অংশ নেয়। বাকি ঘটনায় কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য বাহিনী যুক্ত ছিল। একটি ঘটনায় কোনো বাহিনীর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ক্রসফায়ারের ঘটনা নিয়ে কথা হয় পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কাউকে বিনা বিচারে হত্যার সুযোগ নেই। আমরা সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের এই বার্তা দিয়েছি। অতীতের ঘটনাগুলোতে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।’
২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নিয়ে ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও র্যাবের মধ্যমসারির পাঁচজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, কাউকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বা তাঁদের নির্দেশে। র্যাবের ক্ষেত্রে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) এবং মহাপরিচালক পর্যন্ত এ বিষয়ে জানতেন।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বা আলোচিত কাউকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার আগে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন নেওয়া হতো।
এ বিষয়ে র্যাবের বক্তব্য জানতে গত বুধবার বাহিনীর মুখপাত্র লে. কর্নেল মুনীম ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গতকাল রবিবার পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনের আগে-পরে ক্রসফায়ার বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার আগে ৪ মে থেকে ‘মাদকের বিরুদ্ধে চলো যুদ্ধে’ স্লোগান দিয়ে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। তবে, এই অভিযানের পরেও দেশে মাদকের কারবারের হ্রাস না ঘটলেও, বরং বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৩০০টি ক্রসফায়ারে ৩৫৮ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২০২টি ঘটনায় জড়িত ছিল পুলিশ, ৯৬টিতে র্যাব এবং পুলিশের সঙ্গে অন্যান্য বাহিনীর যৌথ অভিযানে একটি ঘটনার সাক্ষ্য রয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২২৭ জনকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অন্যদের মধ্যে ৪৬ জন ডাকাত বা ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচিত।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ২০১৮ সালে সর্বাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটে; ওই বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ারের ২৪১টি ঘটনায় ৩০৭ জন নিহত হন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে ক্রসফায়ার বেড়ে গেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, ক্রসফায়ার ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিপক্ষকে দমন ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। এ কারণে নির্বাচনের আগে-পরে এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর তথ্যানুসারে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ৬৫১ জন তাদের নেতা-কর্মীকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করেছে, এবং জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের দাবি, একইভাবে তাদের ৫০ জনের অধিক নেতা-কর্মীও নিহত হয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে ক্রসফায়ারসহ বিভিন্ন উপায়ে বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষ হত্যা করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা এবং নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।’
পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১২৪ জন, ২০১৬ সালে ১৬৩ জন, ২০১৭ সালে ১৬৪ জন, ২০২০ সালে ১৪৭ জন ও ২০২১ সালে ৩০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক ইনামুল হক সাগর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমান পুলিশ প্রশাসন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীর প্রচলিত আইনে বিচার হোক।’
নিষেধাজ্ঞার ফলে মানুষের হত্যা নিয়ন্ত্রণে এসেছে দেশ–বিদেশে নানা সমালোচনা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা সরকার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করেনি। বরং সরকার নানাভাবে এসব ঘটনার বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ অবস্থায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ কারণে র্যাব এবং এর সাবেক মহাপরিচালক (পরে আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ সাত শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৪ জন এবং ২০২৩ সালে ১ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হন।
আগামীতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্য কাজ করছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন। এ বিষয়ে কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মানবাধিকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের সংস্কারের কাজ করছি। আমরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের এমন কিছু প্রস্তাব দিতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যার অভ্যস্ততা শেখ হাসিনা সরকারের একপর্যায়ে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মানুষকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গুম করার ভয়ংকর প্রবণতা শুরু হয়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ভুক্তভোগীদের বড় অংশই ছিল বিরোধী দলের নেতা-কর্মী।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে শেখ হাসিনা সরকারের তিন মেয়াদে দেশে পাঁচ শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে অনেকের লাশ পাওয়া যায়, কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং কেউ কেউ অনেক পরে ছাড়া পান। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাকের হিসাবে এখনো ১৫৮ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সংগঠনটি নিখোঁজ এই ব্যক্তিদের তালিকা গত ১৮ আগস্ট প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালকের কাছে দিয়ে আসে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ, হেফাজতে মৃত্যু ও গুমের ঘটনার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছিল। আর এটা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তারা অনেকটা ‘বন্দুকবাজ’ হয়ে ওঠে বলেও আলোচনা রয়েছে।
এর প্রতিফলন দেখা যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ও। তখন আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। এর ফলে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ ও থানাগুলো বিক্ষুব্ধ মানুষের আক্রোশের শিকার হয়।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘একসময়ে কাউকে গুলির কথা বললে আমাদের অন্তরে কাঁপন ধরে যেত। র্যাব গঠনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের গুলি করে হত্যার মাধ্যমে ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি শুরু হয়। তখন মানুষও বাহবা দিতে থাকে। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশও জনপ্রিয় হতে ক্রসফায়ার শুরু করে। এভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ট্রিগার হ্যাপি হয়ে যায়।’ তাঁর মতে, এবারের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের বেপরোয়া গুলির পেছনে গত ২০ বছরের গুলি করার অভ্যস্ততা কাজ করেছে।