শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ঘোষণা করেছে যে তারা ১০২ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে এনে নিজস্ব মজুদ করেছে। এই সোনা আগে লন্ডনের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা ছিল। বিদেশ থেকে সোনার মজুদ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বিপুল পরিমাণ সোনা ভারতে নিয়ে আসা হয়েছে এবং নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনার মজুদ ৮৫৫ টনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৫১০ দশমিক ৫০ টন দেশের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে সোনা মজুত রাখার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেটাই এই তথ্যের প্রতিফলন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মধ্যে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া মোট ২১৪ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে এনেছে, যা ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে সোনার মজুদকে নিরাপদ করার প্রচেষ্টার অংশ। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে যে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিদেশে সোনার মজুদ রাখার তুলনায় দেশে নিরাপদে সংরক্ষণ করা অনেক বেশি নিরাপদ।
তবে, এই সোনার মজুদ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বেশ গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশেষ মিশন পরিচালনা করা হয়েছে। সোনা ফেরত আনতে বিশেষ ফ্লাইট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং ভারত সরকারের কর্মকর্তারা তথ্য ফাঁস না হওয়ার জন্য দিনরাত কাজ করেছেন।
শিপমেন্টে প্রযোজ্য কর প্রত্যাহার করা হয়েছিল, ফলে সোনা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ছিল নির্বিঘ্ন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারত সরকার ভবিষ্যতে আরও সোনা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে, তবে চলতি বছরে বড় পরিমাণ সোনা ফেরত আনার পরিকল্পনা আপাতত নেই।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রা বা সম্পদের রিজার্ভ শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার একটি উপায় হলো সোনায় বিনিয়োগ করা। মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং অর্থনৈতিক চাপে সোনা সব সময় নিরাপত্তা প্রদান করে। আর্থিক সংকট বা মূল্যস্ফীতির সময় সোনা তার মূল্য ধরে রাখে।
যদিও কাগুজে মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই, সোনার তা রয়েছে। আর্থিক সংকট বা বাজারের ওঠানামায় সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনায় বিনিয়োগ করে ঝুঁকি কমায় এবং এর ফলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
ইকোনমিক টাইমস জানায়, চলতি বছরের শুরুতে জানা গেছে যে যুক্তরাজ্য থেকে ১০০ টনের মতো সোনা ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং প্রায় একই পরিমাণ সোনা নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের পর এটাই ছিল ভারতে বড় পরিমাণে সোনা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ, যখন ভারতের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সোনার একটি বড় অংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।
১৯৯০ সালের শুরুর দিকে ভারত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড থেকে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি ঋণ নিয়েছিল। লেনদেনের ভারসাম্যের সংকটের কারণে ভারতের ওই ঋণ নেওয়া প্রয়োজন হয়েছিল। তবে বিনিময়ে দিল্লিকে তার সোনার মজুতের একটি অংশ ব্রিটেনে পাঠাতে হয়েছিল। ভারত ঋণটি দ্রুত পরিশোধ করলেও, ওই সোনার বেশির ভাগই ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থেকে গেছে।
এখনও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এবং ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসে (বিআইএস) ভারতের ৩২৪ টন সোনা সংরক্ষিত রয়েছে। এই দুই ব্যাংক যুক্তরাজ্যে অবস্থিত এবং এই সোনার বড় অংশই ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মজুতের অংশ। পাশাপাশি ২০ টনের কিছু বেশি সোনা স্বর্ণ আমানতের জন্য রাখা আছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনার মজুতকারী ব্যাংক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোনার জন্য তাদের ভল্ট ১৬৯৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা আসার ফলে আরও সম্প্রসারণ ঘটেছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের স্বর্ণ ভল্টে বর্তমানে চার লাখ সোনার বার রয়েছে। সেপ্টেম্বরের দিকে তাদের কাছে মজুত সোনার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৫০ টন। ব্রিটেনের এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনা রাখার সুবিধা হচ্ছে লন্ডনের মূল্যবান ধাতুর বাজারের সুবিধা ব্যবহার করা। চাইলে এই বাজারে সোনা বিক্রি করে দ্রুত নগদ অর্থ তুলতে সুবিধা হয়।
ব্রিটেনে সোনার মজুত রাখার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ভারতে বর্তমানে সেখান থেকে সোনার মজুত ফিরিয়ে আনার পেছনে মূল কারণ হলো বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করেছে। এ কারণে ভারতের মতো দেশ তাদের বিদেশে রাখা সম্পদ নিয়ে আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া যে স্বর্ণের মজুদ দেশে ফিরিয়ে আনছে, তার অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি। তবে, কিছু বাস্তব কারণে ভারত বিদেশে সোনার আংশিক মজুত এখনও রেখে যাচ্ছে। একটি কারণ হলো, বিদেশে রাখা সোনা সহজেই বেচাকেনা, বিনিময় কিংবা জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এছাড়া, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা কেনে, যা বিদেশে রাখা সুবিধাজনক। বর্তমান বিশ্বে আর্থিক বাজারগুলোর পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে বিদেশের সোনা মজুত রাখা প্রয়োজনের সময় দ্রুত ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।