সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন
মাদক সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত একাধিক তারকার নাম উঠে আসার পর পুরো শোবিজ অঙ্গনে চলছে তোলপাড়। জানা গেছে, অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী শুধুমাত্র মাদক সেবনই নয়, বরং মাদক ব্যবসাতেও জড়িত। সম্প্রতি একজন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হওয়ার পর একাধিক মডেল ও অভিনেত্রীর নাম প্রকাশ্যে আসে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
তবে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার নেতৃত্ব দেওয়া এক কর্মকর্তাকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা প্রভাব খাটাচ্ছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা সন্দেহভাজনদের তলবের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, মাদকসহ গ্রেপ্তার হওয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখান থেকেই সাফা, টয়া, তিশা এবং সুনিধি নামে চারজনের নাম উঠে এসেছে। তারা একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে নিয়মিত মাদক সংগ্রহ করতেন। ইতোমধ্যে ওই গ্রুপের অ্যাডমিন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র অরিন্দম রায় দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকার মাদক সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত কর্মকর্তা ডিএনসি ঢাকা মেট্রো উত্তরের সহকারী পরিচালক রাহুল সেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, দীপকে গ্রেপ্তারের পর কয়েকজন প্রথম সারির অভিনেত্রী ও মডেলের মাদক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত ও তথ্য ফাঁস হওয়া ঘটনা
ডিএনসি এবং অন্যান্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ ডিসেম্বর রাহুল সেনের নেতৃত্বে ডিএনসির একটি দল গুলশান ও পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক ধরনের মাদকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এদের মধ্যে কাজী মারুফুল ইসলাম রাজ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করেছেন। তিনি শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকার মাদক সম্পৃক্ততার তথ্য দিয়েছেন।
২০২১ সালের অক্টোবর মাসে দীপ গ্রেপ্তারের পর তার মোবাইলের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট পরীক্ষা করা হয়। এতে সাফা, টয়া, তিশা এবং সুনিধির মতো জনপ্রিয় তারকাদের নাম মেলে। এছাড়া তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া মাদকের অর্ডারের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
মাদক ব্যবসায় তারকাদের সম্পৃক্ততা
শোবিজের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রথমদিকে তারকারা বিভিন্ন ধরনের মাদক স্লিমিং পদ্ধতির জন্য ব্যবহার করতেন। ধীরে ধীরে এদের মধ্যে আসক্তি তৈরি হয়। গত ১০ বছরে যারা মিডিয়া অঙ্গনে এসেছেন, তাদের অনেকে মাদক ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
রাজধানীর বনানী ও গুলশানের বিভিন্ন স্থান মাদক সেবনের আখড়া হিসেবে পরিচিত। বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট ও ছাদের সিসা বারে রাতের বেলায় তারকারা নিয়মিত মাদক সেবন করেন।
সামাজিক প্রভাব ও তরুণ প্রজন্ম
উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এমডিএমএ, এলএসডি এবং কুশের মতো মাদকের চাহিদা বেড়েছে। এসব মাদক থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে চোরাই পথে দেশে আসে। স্ন্যাপচ্যাট, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করা হয়।
বিভিন্ন সাংকেতিক নামে বিক্রি হওয়া এসব মাদক ই-সিগারেটের মতো ভেপ আকারেও সেবন করা হয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী তারকারা দ্রুত ধনী হতে গিয়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। প্রেম বা সংসারে ভাঙনের কারণে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকছেন।
সম্প্রতি মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া, সাফা কবির, সুনিধি এবং তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে গণমাধ্যম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। টয়া কল ব্যাক করে জানান, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তদন্তে ডাকলে তিনি সহযোগিতা করবেন।
শোবিজ অঙ্গনে মাদকের ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই প্রত্যাশা।