শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন
কাজ করতে করতে ক্লান্ত? তাতে কী আসে যায়? চকলেটের মতো আমকড়ালি আকৃতির এক টুকরো আমসত্ত্ব মুখে দিন। দেখবেন, ক্লান্তি উধাও। কারণ, মিষ্টি আমসত্ত্বে রয়েছে প্রচুর গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ, যা শরীরে এনার্জি এনে শক্তি জোগায়। একই সঙ্গে এটি একটি লোভনীয় খাদ্যও বটে।
আমসত্ত্ব নিয়ে কবিতারও গুণগান রয়েছে। যেমন: ‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি/ সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে—হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ/ পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।’ এই কবিতার অংশ এখন বাজারে বিক্রি হওয়া এক আমসত্ত্বের মোড়কে দেখা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৫ জন নারী এই আমসত্ত্ব তৈরি করেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মঈনুল আনোয়ার। তাঁর উদ্যোগে নারীদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মঈনুল এর আগে মধু, সরিষার তেল, খেজুরের গুড় এবং কালিজিরার তেল নিয়েও কাজ করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম আলওয়ান।
বাংলাদেশের পাঁচটি আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আম দেশের মানুষের খুবই প্রিয়। তবে আমের মৌসুম খুবই ছোট। আলওয়ানের আমসত্ত্বের মেয়াদ এক বছর।
পাকা আমের নিংড়ানো রস দিয়ে এই আমসত্ত্ব তৈরি করা হয়। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে প্রথমে আমের খোসা ছাড়িয়ে আঁটি থেকে রস নিংড়ে তা জ্বাল দেওয়া হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় মজাদার আমসত্ত্ব।
আমসত্ত্ব বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্য হলেও বাজারে এর সহজলভ্যতা নেই। অন্যদিকে বাজারে মেলে বিভিন্ন কেমিক্যাল ও রঙ মেশানো বিদেশি ড্রাই ফ্রুটস, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই চিন্তা থেকেই মঈনুল আনোয়ার আমসত্ত্বকে নতুন আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের গবেষণা শুরু করেন। তিনি জানান, ১০০ বছর ধরে আমসত্ত্ব সাধারণত আয়তাকার, বর্গাকার বা বৃত্তাকার আকারে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তিনি আমসত্ত্বকে আমের আকারে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এর নাম দিয়েছেন আমের খাঁচা। মোড়কের গায়ে আমের পরিচয়সহ নানা গুণাবলি উল্লেখ আছে। যেমন ল্যাংড়া আমের আমসত্ত্বের মোড়কে লেখা রয়েছে—দুধ মিশিয়ে তৈরি করা। বাচ্চাদের ক্যান্ডি বা চকলেটের পরিবর্তে খাওয়ানো যাবে। ঈষদুষ্ণ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে দ্রুত শরীরে শক্তি পাওয়া যাবে। যাঁদের প্রদাহজনিত সমস্যা আছে, বা যাঁরা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দুধ ও আমসত্ত্ব একসঙ্গে খেতে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছেন, তাঁদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আশ্বিনা আমের আমসত্ত্বের মোড়কে লেখা আছে, ১৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে। এতে প্রাকৃতিক টারটারিক অ্যাসিড, সাইট্রিকসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক অ্যাসিড রয়েছে। কোনো প্রিজারভেটিভ বা কৃত্রিম ফ্লেভার নেই। ফাঙ্গাস হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
মঈনুল আনোয়ার জানান, ফজলি, আম্রপালি, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া ও গৌড়মতি জাতের আম দিয়ে আমসত্ত্ব তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ফজলি ও আশ্বিনা আমের আমসত্ত্ব সবচেয়ে ভালো। এখন তাঁরা মিষ্টি ও টক-মিষ্টি আমসত্ত্ব তৈরি করেন। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও টক-মিষ্টি আমসত্ত্ব রয়েছে, যেখানে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের পরিমাণ কম। এতে সাকসিনিক ও ম্যালেয়িক অ্যাসিড থাকায় স্বাদ টক।
তিনি আরও জানান, ঐতিহ্যবাহী আমসত্ত্ব ছাড়াও দুধ দিয়ে নতুন আমসত্ত্ব তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমের সঙ্গে তিল ও মসলা মিশিয়েও পরীক্ষামূলকভাবে আমসত্ত্ব তৈরি করা হচ্ছে।
সাধারণত ৫-৭ কেজি আম থেকে ১ কেজি আমসত্ত্ব তৈরি হয়। শুধুমাত্র আমের রস দিয়েই এটি তৈরি করা হয়, কোনো রাসায়নিক বা চিনি ব্যবহার করা হয় না।
গ্রামের নারীরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই আমসত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে তাঁদের বাড়তি আয় হচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর গ্রামের গৃহিণী মারুফা খাতুন বলেন, এবার আমসত্ত্ব তৈরি করে ১০ হাজার টাকা আয় করেছেন। সেই টাকা দিয়ে তিনি দুটি খাসি কিনেছেন। তিনি নিজেও আমসত্ত্ব তৈরি করেছেন এবং মঈনুল আনোয়ারের দেওয়া আম দিয়ে তৈরি করেছেন।
রপ্তানির সম্ভাবনা সম্পর্কে মঈনুল আনোয়ার বলেন, ‘বিদেশে আমসত্ত্বের চাহিদা ভালো। দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানির পরিকল্পনা আছে। আমরা আমসত্ত্বকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করব।’