রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মূল দায়িত্ব হলো দেশ-বিদেশের সংবাদ সংগ্রহ করে তা গণমাধ্যমের সাহায্যে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে দেশের সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত ৫৮৪টি দৈনিক পত্রিকা ও ৩৬টি বেসরকারি টেলিভিশনের মধ্যে বাসসের গ্রাহকসংখ্যা ৫০-এরও কম। বিদেশে বাসসের কোনো গ্রাহক নেই।
বাসস সূত্র জানায়, দেশে ৪৭টি পত্রিকা ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান সংস্থার গ্রাহক হলেও এর মধ্যে মাত্র ২৮টি নিয়মিত সেবা গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি সংবাদ সংস্থার সঙ্গে বাসস খবর আদান-প্রদান করে। তবে তাদের মধ্যে কেউ বাসসের গ্রাহক নয়। বাসস নিজে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির গ্রাহক হলেও তাদের মাধ্যমে সেভাবে আয় করতে পারে না।
বিশ্বের অন্যান্য সংবাদ সংস্থাগুলো সংবাদ বিক্রি করে আয় করে, কিন্তু বাসসের এই খাত থেকে আয় বলতে গেলে প্রায় নেই। সূত্র অনুযায়ী, দেশের গ্রাহকদের কাছ থেকে সংস্থার বছরে ৬৭ লাখ টাকার মতো আয়ের কথা থাকলেও এর প্রায় অর্ধেক টাকা আদায় হয় না। এছাড়া, বাসস মতিঝিলে একটি ভবন ভাড়া দিয়ে বছরে ৬০ লাখ টাকা আয় করে।
সরকার প্রতি বছর বাসসকে ৩৮ কোটি টাকার বেশি অনুদান দিয়ে থাকে, যার বেশিরভাগ কর্মীদের বেতন-ভাতায় খরচ হয়। দলীয়করণ ও অনিয়মের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণে প্রতি বছর এই ব্যয় বাড়ছে, ফলে জনগণের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি ধুঁকছে। বাসসে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৭ শতাংশই সর্বোচ্চ পর্যায়ের গ্রেডে (বিশেষ গ্রেড ও গ্রেড-১) চাকরি করছেন।
১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি বাসস যাত্রা শুরু করে। পাকিস্তানের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) ঢাকা ব্যুরোকে বাসসে রূপান্তরিত করা হয়।
‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা আইন’-এর অধীনে বাসসের দায়িত্ব নির্ধারিত আছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেশ-বিদেশ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার করা। দেশের জাতীয় সংবাদ বহির্বিশ্বে প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়াও বাসসের কাজের মধ্যে পড়ে। এছাড়াও সংবাদ, ফিচার, ছবি ও ভিডিও ক্রয়-বিক্রয় করার দায়িত্বও তাদের রয়েছে।
বাসসের নিজস্ব আয় খুবই কম, দেশি গ্রাহকসংখ্যা সীমিত এবং বিদেশি গ্রাহক একেবারেই নেই। নিয়োগ হয় দলীয় বিবেচনায় এবং পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বাস্তবে বাসসের উল্লেখযোগ্য গ্রাহক নেই। সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সংবাদ প্রকাশ করে এবং ফেসবুক পেজেও বিভিন্ন খবর শেয়ার করে, তবে এসব মাধ্যমে পাঠকদের সাড়া খুবই কম।
বাসসের ওয়েবসাইটে প্রতিদিন কতজন পাঠক প্রবেশ করেন (হিট) তা জানা যায়নি। তাদের ফেসবুক পেজের অনুসারী মাত্র ৫,৬০০ জন, আর সেখানে শেয়ার করা খবরে লাইক পড়ে অত্যন্ত কম।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাহবুব মোর্শেদ বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, বাসসকে আন্তর্জাতিক মানের সংবাদ সংস্থার পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান এবং ধীরে ধীরে সে ধরনের প্রতিবেদন তৈরি ও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অতীতে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাসসের চুক্তি ছিল, কিন্তু এখন নেই। তিনি বলেন, বর্তমান জনবল দিয়ে এ ধরনের কাজ করা কঠিন, তবে তাদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
বাসসের আয়ের উৎস হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি অনুদান, গ্রাহক ফি, সংবাদ, নিবন্ধ, ছবি ও অন্যান্য পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও রয়্যালটি, এবং বিজ্ঞাপনের আয় আইনে উল্লেখ আছে। তবে নিজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ বাসস কখনো নেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) বাসসের জন্য সরকারি অনুদান ছিল ৩৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি টাকা কর্মীদের বেতন-ভাতায় খরচ হয়েছে। কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ভাতা বাবদ প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিজ্ঞাপন থেকে বাসসের আয় নেই বললেই চলে, তবে গত অর্থবছরে বাসস বিজ্ঞাপন খাতে দেড় লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ গণমাধ্যমকে জানান, দেশি গ্রাহক তুলনামূলকভাবে কম। তবে অনেক গণমাধ্যম বাসসের ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদন নিয়ে ব্যবহার করে। গ্রাহকসংখ্যা বাড়াতে এবং পাওনা আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাসসের ওয়েবসাইট থেকে আয় এবং অডিও-ভিডিও সেবা চালু করে আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। মতিঝিলের পুরোনো ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন করা গেলে সেখান থেকেও আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বাসস নবম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান করে থাকে। নবম ওয়েজ বোর্ডে বিশেষ গ্রেড শুধু ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও প্রধান সম্পাদকের জন্য নির্ধারিত। তবে বাসসে ৫০ জন কর্মী বিশেষ গ্রেডে রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৮ জন সংবাদকর্মী এবং প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের দুই প্রধান। এছাড়া, গ্রেড-১-এ রয়েছেন ১১ জন সাংবাদিকসহ মোট ৩০ জন। ১৭২ জন কর্মীর মধ্যে ৮০ জনই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন বিশেষ গ্রেড ও গ্রেড-১ অনুযায়ী।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে যাঁরা বাসসে কাজ করেন, বিশেষত সংবাদকর্মীরা, তাঁদের মধ্যে দুটি স্পষ্ট বিভক্তি রয়েছে—একটি পক্ষ আওয়ামী লীগ সমর্থক, অন্যটি বিএনপি বা জামায়াতপন্থী। নব্বইয়ের দশক থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় বাসসে অতিরিক্ত ও অযোগ্য জনবল নিয়োগ, নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি ও স্বজনপ্রীতিসহ নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাসসে বঞ্চনা ও হয়রানির অভিযোগও দেখা দেয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাসসে ৫২ জন সাংবাদিক ও কর্মকর্তাকে গ্রেড-১ এবং ২৭ জনকে বিশেষ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা নিয়ম লঙ্ঘন করেই হয়েছে। ২০১২ সালের ১২ জুলাই বাসসের পরিচালনা বোর্ডে এসব পদোন্নতির ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০২ সালের পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী, বিশেষ গ্রেডে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রথম গ্রেডে কমপক্ষে ১০ বছর চাকরি করার নিয়ম রয়েছে। তবে ওই ২৭ জনের কেউই এই শর্ত পূরণ করেননি, তাঁরা প্রথম গ্রেডে মাত্র এক থেকে পাঁচ বছর চাকরি করেছিলেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালের পরিচালনা বোর্ডের সভার সময় বাসসের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন প্রয়াত ইহসানুল করিম, যিনি শেখ হাসিনার সাবেক প্রেস সচিব ছিলেন। এসময় পদোন্নতি দেওয়ার মূল যুক্তি ছিল ‘বৈষম্য নিরসন’ এবং ‘সুস্থ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট বাসসে প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক ও কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরা সবাই বিএনপি বা জামায়াত সমর্থক, এবং তাঁরা দাবি করেছিলেন, আওয়ামী লীগ আমলে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। বাসসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ এই পদোন্নতি দিয়ে যান, যা বাসসের বেতন ভাতার খরচ বাড়িয়ে মাসে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ লাখ টাকা বৃদ্ধি করেছে।
গণমাধ্যমের হাতে আসা এক আদেশে দেখা যায়, একজন স্টাফ রিপোর্টারকে একই আদেশের মাধ্যমে তিনটি পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা অতীতে কখনো হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, স্টাফ রিপোর্টার থেকে বিশেষ গ্রেডে যাওয়ার জন্য আরও কয়েকটি গ্রেড পার করতে হয়, তবে তাঁকে সরাসরি বিশেষ গ্রেড দেওয়া হয়। এতে তাঁর বেতন প্রায় ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পায়।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেশিরভাগ নিয়োগ ও পদোন্নতি পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই হয়েছে। সাবেক এমডি আবুল কালাম আজাদের আমলে ১০ জনকে বিশেষ গ্রেড ও গ্রেড-১-এ পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২ মে পরিচালনা বোর্ডের সভায় এই পদোন্নতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, আজাদ এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেননি।
বাসসের কাঠামোও মাথাভারী হয়ে পড়েছে। সংস্থাটির মোট ১৯৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে অনেক পদে জনবল সংকট থাকলেও, কিছু কিছু পদে অতিরিক্ত জনবল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১২টি বার্তা সম্পাদক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৪ জন, আর বিশেষ সংবাদদাতার ১১টি পদের বিপরীতে আছেন ১৯ জন।
স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বাসসের একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, আবুল কালাম আজাদ তাঁর ছয়জন আত্মীয়কে বাসসে নিয়োগ দেন। এ ছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের তিনজন আত্মীয়কেও চাকরি দেওয়া হয়।
সাবেক এমডি আবুল কালাম আজাদ নিয়ম ভেঙে নিজের জন্য ২৩ হাজার টাকা গাড়ি ভাতা নিতেন, যদিও বেতন-ভাতার মধ্যে এ খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বাসসে ২০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করা হলেও, দুদক তদন্ত করেনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন দলটির সমর্থকরা। সরকার পরিবর্তনের পর এসব পদে বিএনপি সমর্থকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন এমডি মাহবুব মোর্শেদ ক্ষমতায় আসার পর এই পদোন্নতিগুলো নিশ্চিত করা হয়।
বাসসের পরিচালনা বোর্ড ১৩ সদস্যের, যাঁদের মধ্যে ছয়জন সরকারি প্রতিনিধি। ২০২৩ সালের পরিচালনা বোর্ডেও দলীয় বিবেচনায় সদস্য মনোনীত করা হয়েছিল। বাসসের পরিচালনা বোর্ডে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দ্য পিপলস লাইফের সম্পাদক আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক এবং একাত্তর টিভির সাবেক এমডি মোজাম্মেল হক ছিলেন।
গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, বাসস, বিটিভি, ও বেতারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে না। এরা মূলত দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।