শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩২ অপরাহ্ন
১৮ ডিসেম্বর, রাত পৌনে ৯টা। রাজধানীর মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন হাফেজ কামরুল হাসান। এই সময় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। ছিনতাইকারীরা তাঁর পেটে ছুরিকাঘাত করে মুঠোফোন ও সাত হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গতকাল শনিবার জানিয়েছে, কামরুল হাসানকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাজধানীতে এমন অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতে ও ভোরে চলাচল করতে মানুষ এখন ভীতসন্ত্রস্ত। চুরি ও ডাকাতির ঘটনাও বাড়ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ঢাকার কেরানীগঞ্জে ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ ও ঢাকার আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ঢাকার ৫০টি থানা এলাকায় গত ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ দিনে অন্তত ৩৪টি ছিনতাই মামলা দায়ের হয়েছে। এ সময় ছিনতাইকারীদের হাতে একজন নিহত এবং চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের ঘটনা নিয়ে এখন বেশি আলোচনা হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
গত ৫ আগস্ট থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন সাতজন। সর্বশেষ ১৮ ডিসেম্বর মেয়র হানিফ উড়ালসড়কে নিহত হন কামরুল হাসান। এর আগে ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজারে হাবিব উল্লাহ নামে এক তরুণ ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান।
চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়ে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের (রবারি বা দস্যুতা) মামলা হয়েছে ৬৫টি, যেখানে গত বছর একই সময়ে মামলা ছিল ৬৭টি। যদিও সংখ্যায় পার্থক্য কম, পুলিশ জানাচ্ছে এ বছরের আগস্ট মাসে পুলিশের কার্যক্রম প্রায় অচল ছিল এবং এখনো তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এক কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের প্রবেশপথে তাঁর বাসার আসবাব বহনকারী ট্রাক যানজটে আটকে পড়লে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল তাঁর বন্ধুকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
রাজধানীতে ডাকাতির ঘটনা তুলনামূলক কম হলেও মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়ে ডাকাতির মামলার সংখ্যা ছিল ১৭টি, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল ৬টি। চুরির ঘটনায় এবার মামলা হয়েছে ৩৪০টি, যা গত বছরের ৫৩৪টির তুলনায় কম।
অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে প্রকৃত অপরাধ চিত্র পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়।
ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী জানান, অপরাধের পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষত মুঠোফোন ছিনতাই এখন সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। তিনি রাস্তায় চলাচলের সময় মুঠোফোন ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ছিনতাইয়ের মামলার তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর সময়ে মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, হাতিরঝিল এবং শাহজাহানপুর থানায় সর্বাধিক তিনটি করে ছিনতাই মামলা হয়েছে। হাজারীবাগ, মিরপুর এবং শাহআলী থানায় দুটি করে এবং ১৬টি থানায় একটি করে মামলা হয়েছে।
সম্প্রতি আসাদগেট এলাকায় একটি ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে।
ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ছিনতাইয়ের ঘটনায় আলী হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী প্রাণ হারান। যাত্রাবাড়ীতে এ ঘটনায় তাঁর ছেলে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, কিন্তু অপরাধীদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
বিদেশি নাগরিকরাও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। চীনের নাগরিক লিজিং ১১ নভেম্বর রাজধানীতে সোনার চেইন ছিনতাইয়ের শিকার হন। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ছিনতাইকারীরা সাধারণত দলবদ্ধ হয়ে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করে। ডিএমপির গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, অপরাধ দমনে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
তবে অনেক ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না। মতিঝিল থানায় কনস্টেবল সোহেল রানার ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
ডিবি পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনায় হাতিরঝিল এলাকায় এক পরিবারের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও সোনা লুট করা হয়। আদাবরে আরেকটি ডাকাতির ঘটনায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
চুরি, ছিনতাই এবং ডাকাতির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একজন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহ আলমের বাসায় চুরি হওয়ার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেছেন, অপরাধপ্রবণ এলাকায় অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাতে পুলিশের টহল কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো