শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন
দেশে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬২ লাখ। অন্যদিকে, সরকারের হিসেবে ‘অবৈধ’ তিন চাকার যানবাহন রয়েছে প্রায় ৭০ লাখ। বৈধ যানবাহনের মধ্যে বাস-মিনিবাসসহ গণপরিবহনের সংখ্যা দুই শতাংশেরও কম। এই অপ্রতুলতার সুযোগে, কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ও ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার যানবাহন সারা দেশ, এমনকি রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত ছেয়ে গেছে। এসব যানবাহনের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে এখন তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বরং, এই ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনগুলো সড়ক দুর্ঘটনার হার বাড়িয়ে তুলছে।
গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট একটি নির্দেশনায় ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল তিন দিনের মধ্যে বন্ধ করতে বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে বলেছেন। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। ওইদিন রাতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী, আফসানা করিম, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় নিহত হন। এর পরপরই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। প্রাণহানির দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনা। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় চালক ও আরোহী মিলিয়ে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২৪ জন, যা মোট প্রাণহানির ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, তিন চাকার যানবাহন যেমন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, এবং অটোভ্যানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৯৭ জন; যা মোট নিহতের ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সরকার নিবন্ধন না দেওয়ায় এসব যানবাহনকে অবৈধ বলে গণ্য করা হয়।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এহসানুল হক গণমাধ্যমকে জানান, তাঁরা এখনো আদালতের আদেশ হাতে পাননি। আদেশ পাওয়ার পরই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার অবৈধ যানবাহনের সঠিক সংখ্যা সরকারের কোনো দপ্তরেই নেই। তবে ২০১০ সালের দিকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এসব যানের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বিআরটিএ, যাত্রী অধিকার সংগঠন, পুলিশ, এবং অন্যান্য অংশীজনদের মতে, বর্তমানে ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে রয়েছে প্রায় ৫০ লাখ, আর ঢাকায় প্রায় ১০ লাখ। তবে অনেকের মতে, এই সংখ্যা ১৫ লাখের কম হতে পারে না।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান জানান, তিন চাকার এসব যানবাহনের কাঠামোগত এবং যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে। তিনি বলেন, এত বেশি সংখ্যক ত্রুটিযুক্ত যানবাহনের চলাচল অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এসব যানবাহনের সঙ্গে অনেক মানুষ সরাসরি যুক্ত থাকায় এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায়, এগুলো হুট করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি সুপারিশ করেন, এসব যানবাহনকে নীতিমালার আওতায় এনে কারিগরিভাবে উন্নয়ন করা উচিত। কোন সড়কে, কী পরিমাণে এসব যান চলবে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বিআরটিএ ২০ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন দিয়ে থাকে। গত অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬২ লাখ। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস রয়েছে মাত্র ৮৪ হাজার, যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তিন চাকার যানবাহনের মধ্যে শুধু অটোরিকশা এবং অটোটেম্পোর নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার। অন্যদিকে, নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ তিন চাকার ছোট যানবাহন চলাচল করছে। এদের মধ্যে রয়েছে নছিমন, করিমন, আলমসাধু, ভটভটি, ইজিবাইক এবং পাখি। সাম্প্রতিক সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারি বা যন্ত্রচালিত রিকশা।
তিন চাকার অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধে বাধা হিসেবে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে বলে জানা যায়। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বহুবার বলেছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনীতিকরা এসব যানবাহনের চলাচলে জড়িত। ফলে, এগুলো বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চালক-মালিকদের এই যানবাহন চালাতে বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনীতিকরা এই চাঁদার ভাগ পান। গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন।
২০১০ সালে রাজশাহীতে প্রথম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনুমোদন দেন তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। এরপর দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তিন চাকার কিছু যানবাহনের নিবন্ধন দিয়েছেন। তবে এসব নিবন্ধনের আগে কোনো কারিগরি সমীক্ষা করা হয়নি।
২০১৫ সালে তৎকালীন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। তবে ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চালকেরা ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর, এবং অগ্নিসংযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে’ রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
এ সিদ্ধান্তের পর থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। এসব যানবাহন আগে অলিগলিতে চললেও, এখন প্রধান সড়কেও চলতে দেখা যায়।
বুয়েটের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, প্রথম থেকেই যদি এ সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে ভালো হতো। তবে এখন যেহেতু বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
সূত্র: আনোয়ার হোসেন (প্রথম আলো)