শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন
চট্টগ্রামে গান গেয়ে পিটিয়ে হত্যা করা যুবককে ছিনতাইকারী হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন নির্যাতনকারী যুবকেরা। শাহাদাত হোসেন নামের সেই যুবককে হত্যা করার সময় হামলাকারীদের উল্লাস করতে দেখা যায়। শাহাদাতকে মারধর করার সময় একজন হামলাকারী আশপাশে থাকা পথচারীদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, ‘ভাইয়া, সবাই সেলফি তুলুন।’ আজ বুধবার দুপুরে নগর পুলিশের কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করেন পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে রয়েছেন ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী (৪২), আনিসুর রহমান (১৯) এবং ১৬ বছর বয়সী একজন কিশোর। গতকাল মঙ্গলবার রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে পাঁচলাইশ থানার পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, আসামিরা ‘চট্টগ্রাম ছাত্র–জনতা ট্রাফিক গ্রুপ’ নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য। ফরহাদ ছিলেন ওই গ্রুপের অ্যাডমিন। তবে মূল ধারার ছাত্র–জনতা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই গ্রুপটি ফরহাদ নিজেই তৈরি করেন।
গত ১৩ আগস্ট নগরের পাঁচলাইশ ২ নম্বর গেট এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে শাহাদাত হোসেনকে একটি ট্রাফিক পুলিশ বক্সের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মারধরের সময় উল্লাস করতে থাকা কিশোর আশপাশের লোকজনকে সেলফি তুলতে বলে। পরে তাঁর মৃতদেহ প্রবর্তক মোড়ে ফেলে রাখা হয় ঘটনা গোপন করতে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের তথ্য মতে, সেদিন ‘ছিনতাইকারী’ বলে চিৎকার করে শাহাদাতকে ধাওয়া করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, শাহাদাতের সঙ্গে সাগর নামের একজন বন্ধু ছিল। সাগর পালিয়ে গেলেও শাহাদাত ধরা পড়ে যান। যদিও সেদিন উপস্থিত জনতার ভিড়ে ঠিক কার কাছ থেকে ছিনতাইয়ের চেষ্টা হয়েছিল, তা এখনও জানা যায়নি। শাহাদাতের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র ও ডাকাতিসহ নয়টি মামলা ছিল। সাগরও পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) কাজী তারেক আজিজ এবং পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ সুলাইমান।
ওসি মোহাম্মদ সুলাইমান বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ফরহাদ ইট–বালুর ব্যবসা করেন, আনিস একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী, আর ১৬ বছরের কিশোরের শিক্ষাগত যোগ্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে হাজির করা হবে বলে জানান তিনি।
গত শনিবার ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল যুবক ‘মধু হই হই আঁরে বিষ খাওয়াইলা’ গানের তালে নেচে আনন্দ করছে এবং একই সাথে এক যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পেটাচ্ছে। মার খাওয়ার পর যুবকটির মাথা ঝুঁকে পড়ে এবং একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে যান।
পরে পুলিশ শাহাদাতের স্ত্রী শারমিন আক্তারকে ভিডিওটি দেখিয়ে নিশ্চিত করে যে, পেটানো যুবক শাহাদাত। ঘটনাটি ঘটে ১৩ আগস্ট, যখন থানায় পুলিশ কর্মী প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
নিহত শাহাদাত নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানার পাঁচবাড়িয়া ইউনিয়নের নদনা গ্রামের মিয়াজান ভূঁইয়ার ছেলে। পরিবারসহ তিনি চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার বিআরটিসি এলাকার ব্রয়লার কলোনিতে থাকতেন। ১৪ আগস্ট প্রবর্তক মোড়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালের পাশে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। ১৫ আগস্ট শাহাদাতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় বলা হয়, ১৩ আগস্ট বেলা দুইটার দিকে কাজের জন্য বের হয়েছিলেন শাহাদাত। সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী শারমিন ফোন করলে তিনি জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরবেন। কিন্তু রাত বাড়লেও শাহাদাত ফিরে না আসায় শারমিন ফোন করেন, কিন্তু ফোন বন্ধ পান। পরদিন সকালে শাহাদাতের চাচা জানতে পারেন, প্রবর্তক মোড়ের কাছাকাছি রাস্তার পাশে তাঁর ভাতিজার লাশ পড়ে আছে।