সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৭:০১ অপরাহ্ন
চার মাস ধরে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আজ সোমবার দুপুরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে ময়মনসিংহের নান্দাইলের এক কিশোরী। অপহরণ, ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের নির্মমতার পর চোখ উপড়ানোর মতো ঘটনাও তার জীবনে ঘটে। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনায় পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। জানা যায়, ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরুইল ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামের মো. আবুল কালামের মেয়ে পাপিয়া আক্তার (১৪) এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার। সে স্থানীয় বাকচান্দা ফাজিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
ঘটনার সূত্রপাত গত জুন মাসে। কচুরী গ্রামের মো. হানিফ মিয়ার ছেলে হোসাইন (১৯), যে একই এলাকার বাকচান্দা আব্দুস সামাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র, পাপিয়াকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় গত ১ জুন সে পাপিয়াকে জোরপূর্বক অপহরণ করে। এরপর চার মাস তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটক রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে গুরুতর আহত অবস্থায় পাপিয়াকে বাড়ির সামনে সড়কের পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে ময়মনসিংহ এবং পরে ঢাকার আগারগাঁও চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসার সময় তার ডান চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা অপসারণ করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, বাম চোখ বাঁচানোর চেষ্টা চালানো হলেও অর্থাভাবে চিকিৎসা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। কর্নিয়া সংরক্ষণ করে রাখা হলেও তা আর প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ দিন যন্ত্রণা ভোগের পর সোমবার দুপুরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে পাপিয়া।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পাপিয়ার পরিবার এবং এলাকাবাসী শোকের সাগরে ডুবে যায়। পাপিয়ার মা মোছাম্মৎ রানু আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মৃত্যুর আগে আমার মেয়ে বলেছিল, আম্মা, হোসেনের চোখটা এনে দাও। আমি বাঁচার আগেই বিচার দেখে যেতে চাই। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমি এর বিচার চাই।”
পাপিয়ার বাবা আবুল কালাম বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে বলেন, “আমার মেয়ে এত কষ্ট পেয়ে তিলে তিলে মারা গেল। আমি এক ব্যর্থ বাবা, কিছুই করতে পারলাম না। আমার মেয়ের জন্য বিচার চাই।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত নান্দাইল থানার ওসি ফরিদ আহম্মেদ জানান, “মেয়েটি এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এসেছিলাম। এই মামলাটি আদালতে যাওয়ায় তদন্তের দায়িত্ব পিবিআই পেয়েছিল। এখন ময়নাতদন্তের পর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, আদালতে বিচার চেয়ে মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় ময়মনসিংহ পিবিআইকে। পিবিআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক মোসলেহ উদ্দিন জানান, সিআর মামলায় প্রতিবেদন দেওয়া ছাড়া তার কিছুই করার ছিল না। তবে মেয়েটির মৃত্যুর পর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।
ময়মনসিংহ পিবিআই পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, “এখন আমরা নিজেরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করব। প্রয়োজনে নতুন মামলা করেও পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে।”
পাপিয়ার মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠছে, এই বিচার কি হবে? নাকি বিচারহীনতার চক্রে হারিয়ে যাবে আরেকটি জীবনের গল্প?