শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:০৯ পূর্বাহ্ন
কৌশিক হোসেন তাপস—যিনি গানবাংলার সিইও এবং চেয়ারম্যান—একাধিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গানে কণ্ঠ মেলানো, নিজের মেয়ের বিয়েতে ভারতীয় অভিনেত্রী সানি লিওনকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ, এবং এক অভিনেত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের খবর তাকে আলোচনায় রেখেছে। এ ছাড়া, গানবাংলা চ্যানেল অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে গত সোমবার কারাগারে পাঠায়।
তাপস সম্পর্কে উঠে এসেছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। একসময় তার জীবিকা চলত বাসাবাড়িতে ঘুরে প্রাইভেট পড়িয়ে। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম বেতনে চাকরিও করেছেন। তিনি বেসরকারি টেলিভিশনে তবলাবাদক হিসেবে কাজ করতেন। তবে তার ভাগ্য পাল্টে যায় যখন কৌশলে রবিশঙ্কর মৈত্রীর নামে নিবন্ধিত গানবাংলা টেলিভিশনের মালিকানা নিজের দখলে নিয়ে নেন। এরপর, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত হয়ে ওঠেন। কালো স্টুডিওতে বিশেষ আসরের আয়োজন করে ও সরকারের বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে তিনি বড় বড় কাজ হাতিয়ে নিতেন। মুজিব শতবর্ষ প্রচার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৮ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহের আলোক উৎসবে তাপস ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে মাত্র ২ কোটি টাকা খরচ করেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়ে। তাকে নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তাপস ও তার স্ত্রী ফারজানা মুন্নীর আর্থিক দুর্নীতি এবং অপকর্ম নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। তাপস একসময় ফারজানা মুন্নীর মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতেন এবং পরে তার মাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেন। এরপর তিনি মুন্নীর সম্পদ ও প্রভাবকে ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। গান পরিচালনা থেকে জমির দালালি পর্যন্ত করেছেন। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
গানবাংলা চ্যানেল দখলের পেছনে ছিল জটিল কৌশল। ২০১১ সালে রবিশঙ্কর মৈত্রী গানবাংলার লাইসেন্স পেলেও ২০১২ সালে তাপস ও মুন্নী শেয়ার কিনে চ্যানেলের পরিচালক হন। পরে সাজানো মামলায় রবিশঙ্করকে ফাঁসিয়ে চ্যানেলটি পুরোপুরি দখলে নেন। তখনকার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন তাকে সহযোগিতা করেছিলেন বলে অভিযোগ।
তাপস বিভিন্ন দেশ থেকে নারী শিল্পী এনে গানবাংলার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতেন। গুলশান ও খিলক্ষেতের অভিজাত হোটেলগুলোতে তাদের সরবরাহ করে বিপুল টাকা আয় করতেন। কালোঘর স্টুডিও নামে গোপন আসর বসত, যেখানে বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য মদ ও সিসার আয়োজন থাকত। সেখানে আসা ব্যক্তিদের গোপনে ভিডিও করা হতো, যা পরে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হতো। এভাবে ঠিকাদারি কাজ ও অন্যান্য প্রভাবশালী কাজ আদায় করতেন।
২০১৮ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহের আলোক উৎসবের দুর্নীতির প্রসঙ্গে বলা হয়, তাপস মাত্র ২ কোটি টাকা খরচ করে ২৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করেনি। এমনকি দুদকও বিষয়টি রহস্যজনকভাবে অনুসন্ধান করেনি।
জয় বাংলা কনসার্ট ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাপস কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্মরণে প্রতি বছর জয় বাংলা কনসার্ট আয়োজনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ব্যাপক জালিয়াতি করেন বলে অভিযোগ।
মুজিব বর্ষের প্রচার কাজেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে সরকারের উন্নয়ন কাজ প্রচারের জন্য প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার প্রকল্পে অংশ নেন তাপস। এ কাজে ৮০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে অংশ নেন এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ।
গানবাংলার নামে ভবন দখলের অভিযোগও রয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গানবাংলা ভবনে ভাঙচুর হলে, তাপস বারিধারার জে ব্লকের একটি ভবন দখল করেন। তিনি নিজের রঙ পাল্টে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ডিএমপি জানিয়েছে, উত্তরা পূর্ব থানায় করা একটি মামলার এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে তাপসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত ১৮ জুলাই এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ইশতিয়াক মাহমুদ, যিনি পরে মামলা করেন। প্রগতি সরণিতে গানবাংলা টেলিভিশনের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে জামিন আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।