শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, ‘যে ধ্বংসস্তূপ রেখে গেছে, সেখান থেকে বের হওয়া বেশ কঠিন। যেদিকে হাত দিই, সেদিকেই জঞ্জাল। এই জঞ্জাল পরিষ্কার করেই চলেছি। কাজ শুরু করতে গিয়ে নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এসব কথা বলেন। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘পুরো সিস্টেমটাই ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। চারদিকে চুরিচামারি, ব্যাংক কার্যকর নয়। কমিটি অর্থনীতির শ্বেতপত্র দিয়েছে। আমি বলেছি, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। আমি মনে করি, এটি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো উচিত। দেশের অর্থনীতিকে যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, এর দায় আওয়ামী লীগের। তবে যাঁরা উন্নয়নের গল্প শুনিয়েছেন, তাঁদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে।’
এ সময় শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা ও সমর্থন জানিয়ে সংস্কারকাজে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তাঁরা জানান, দেশের মানুষ সরকারের পাশে আছে। এটি গণমানুষের সরকার। জনগণ চায়, অন্তর্বর্তী সরকার যেন প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে।
ড. ইউনূস শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘দেশের মানুষ ছাত্রদের ওপর ভরসা করে। এই বিশ্বাস ধরে রেখো; এটি কখনো হারিয়ে ফেলো না। তোমরা কখনোই হতাশ হবে না। অসম্ভবকে সম্ভব করেছ। দেশ বদলে দিয়েছ। ভবিষ্যতেও তোমরা পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের আশা পূরণের দায়িত্ব তোমাদের। অন্তত সেই পথে এগিয়ে যেতে হবে। এক বিজয় অর্জন করেছ, আরও অনেক বিজয় আসবে। তোমরা আমাদের সতর্ক হতে, সচেতন থাকতে বারবার মনে করিয়ে দেবে।’
শিক্ষার্থীরা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, অভ্যুত্থানে শহীদদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদান, আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে জোর দেন। তাঁরা আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চলছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব স্বাগত জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে হবে। সিন্ডিকেট বা অন্য কোনো অজুহাত আমরা চাই না। কতগুলো মানুষ বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, এটি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি এবং রমজানেও যাতে স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিচ্ছি।’
স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার সংস্কারে একটি কমিশন আছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী আমরা কাজ করব। ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে চাই। উচ্চপর্যায়ে অল্প কিছু জিনিস থাকবে। সঠিক ব্যবস্থার অভাবে ফান্ড অপচয় হয়। এটি সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নিচ্ছি।’
জুলাইয়ের শহীদদের সম্মান জানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কাজ চলছে। জুলাইয়ে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অবদান কখনো ভুলব না। তাঁদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।’
শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে মানুষ শিক্ষিত ও দক্ষ হয়ে উঠতে না পারে। পরিকল্পিতভাবে বেকারত্ব বাড়ানো হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক কিছু রাখা হয়নি। তরুণদের দক্ষ করে তুলতে হবে।’
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে নারী শিক্ষার্থী ছিল মাত্র চারজন। এখন তা ৫২ শতাংশ। এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বলয়ের মাধ্যমে আসন বণ্টনের যে দাসপ্রথা ছিল, তা ভেঙে গেছে। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।’
শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং কাজ প্রচারে বাধার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে সরকারের সমালোচনা করে। সরকারের কোনো নিজস্ব গণমাধ্যম নেই, শুধু প্রেস উইং আছে। তারা প্রেস রিলিজ পাঠায়, কেউ ছাপে, কেউ ছাপে না বা ছোট আকারে দেয়। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করুক, এটাই আমাদের নীতি।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রেস উইং তাদের মতো চেষ্টা করছে। সরকারের কাজ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, এটি মন খারাপের বিষয় হলেও আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে বসেছি। তোমরা সরকারের কাছে কী চাও, কী পরামর্শ দাও, তা জানাই আমার উদ্দেশ্য।’
ড. ইউনূস বলেন, ‘তোমরা রাষ্ট্রের অভিভাবক। রাষ্ট্রের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব ভুলো না। তোমাদের সঠিক ভূমিকা দেশকে সঠিক পথে রাখবে। নিজেদের অভিভাবকত্ব ভুলে গেলে দেশ বিপথে যাবে না।’