শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্ভাবিত টেকসই উন্নয়ন তত্ত্ব, ‘থ্রি জিরো’, এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) অর্জনের জন্য সরকারের কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় স্তরে এই তত্ত্বের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
‘থ্রি জিরো তত্ত্ব’ হলো একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা দারিদ্র্যমুক্তি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে লক্ষ্য করে। এটি তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে: শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ। এই তত্ত্ব বাস্তবায়নে প্রয়োজন তারুণ্যের উদ্যম, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, সুশাসন এবং সামাজিক ব্যবসার সংমিশ্রণ। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস এই তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা অর্জন করেছেন।
টেকসই উন্নয়নের মূল চেতনা, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ, এসডিজির লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে ‘থ্রি জিরো তত্ত্ব’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে সরকারের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক এবং সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ বলেন, “আমরা এসডিজির সঙ্গে থ্রি জিরো তত্ত্বকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কর্মশালার মাধ্যমে এই তত্ত্ব নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছি।”
তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, থ্রি জিরো তত্ত্বের প্রয়োগ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। এটি স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে। এসডিজির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, বৃহৎ আকারে সরকারের অন্য কোনো ক্ষেত্র এই তত্ত্বকে সরাসরি বাস্তবায়ন করছে না।
ড. ইউনূসের মতে, দারিদ্র্যের উৎপত্তি মানুষ নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর থেকেই দারিদ্র্যের জন্ম হয়। তাই দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে উদ্যোক্তা তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “মানুষের জন্ম হয়েছে সমস্যার সমাধান করার জন্য, চাকরি খোঁজার জন্য নয়। তরুণ প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে।”
সম্প্রতি আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে ড. ইউনূস তার থ্রি জিরো তত্ত্বের প্রভাবশালী প্রয়োগের দিকগুলো তুলে ধরেন। তার মতে, এটি নতুন সভ্যতার সূচনা করবে এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, “এই তত্ত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন সম্ভব এবং এটি কোনো বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে নয়, বরং স্বেচ্ছায় গ্রহণযোগ্য হবে।”
‘থ্রি জিরো পারসন’ সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, এই ব্যক্তি কার্বন নিঃসরণ করবে না, সম্পদের মজুদকারী হবে না এবং নিজের প্রচেষ্টায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং কার্বন নিঃসরণের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা সম্ভব।
থ্রি জিরো ক্লাবের কার্যক্রম নিয়ে লামিয়া মোরশেদ বলেন, “এই ক্লাবের সদস্যরা থ্রি জিরো তত্ত্ব সম্পর্কে সচেতন হন এবং একসময় নিজেরা এই তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬০০টি থ্রি জিরো ক্লাব রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত।”
বাংলাদেশে থ্রি জিরো ক্লাবের প্রসার তুলনামূলক কম হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কার্যক্রম বাড়ছে। লামিয়া মোরশেদ জানান, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য থ্রি জিরো ক্লাব গঠন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে এখন আগ্রহ বাড়ছে এবং নানা কর্মশালার মাধ্যমে এই তত্ত্বের প্রচার বাড়ানো হচ্ছে।
একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়, যেমন টেকসই কার্যক্রম পরিচালনা এবং দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ। এছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন যে, ড. ইউনূস সবসময় বলেন, “সমস্যা আমাদের নিজেদের সৃষ্টি, এবং তার সমাধানের দায়িত্বও আমাদের ওপর। তরুণদের চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে তা সম্ভব।”
ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার ধারণা থ্রি জিরো তত্ত্বের সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণা এমন একটি ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে উদ্যোক্তা নিজে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন এবং মুনাফা জনকল্যাণে ব্যয় করবেন। তিনি বলেন, “মুনাফার অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের উন্নয়নে ব্যবহার করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।”
সামাজিক ব্যবসা প্রসারের অংশ হিসেবে ড. ইউনূস বিশ্বজুড়ে ৩৯টি দেশের ১১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার স্থাপন করেছেন। এসব সেন্টারে মাইক্রোক্রেডিট এবং উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতি শেখানো হয়। থ্রি জিরো ক্লাবের মাধ্যমে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে আগামী জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য যুব সম্মেলনে থ্রি জিরো তত্ত্বকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে লামিয়া মোরশেদ বলেন, “যুবসমাজকে শূন্য বর্জ্যের ধারণা এবং পরিবেশবান্ধব আচরণে উদ্বুদ্ধ করতে খেলাধুলার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।”
অধ্যাপক ইউনূসের থ্রি জিরো তত্ত্ব আন্তর্জাতিক স্তরে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ ড. এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, “এই তত্ত্ব তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এনে দেবে এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।”
সূত্র: ইনকিলাব