সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
কিছু বছর আগেও রোগীরা যখন বিদেশে চিকিৎসা নিতেন, তখন বলতেন, “বাংলাদেশে অনেক পরীক্ষা করিয়েছি, কিন্তু আমার শরীরে ভিটামিন ডি কম তা কেউ বুঝতেই পারেনি!”
কিন্তু আমেরিকান ও ইউরোপীয় এন্ডোক্রাইন সোসাইটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজন ছাড়া সবার জন্য ভিটামিন ডি পরীক্ষা করা প্রয়োজন নেই। এই ব্যয়বহুল পরীক্ষা আজকাল রুটিন পরীক্ষার মতো প্রচলিত হয়ে গেছে। তবে জানা থাকা উচিত যে, ভিটামিন ডি কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা নয়।
যে মাঝি খালি গায়ে গান গেয়ে নদী পার হন কিংবা যে কৃষক মাঠে কাজ করেন, তাঁদের খাদ্য হয়তো সব সময় পুষ্টিকর না–ও হতে পারে। কিন্তু তাঁদের রক্ত পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে ভিটামিন ডি যথেষ্টই রয়েছে। কারণ, ভিটামিন ডি ‘সানশাইন ভিটামিন’ নামেও পরিচিত। সূর্যের আলো যখন আমাদের শরীরে পড়ে, ত্বকে সঞ্চিত কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন ডি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়। এরপর এটি রক্তের মাধ্যমে লিভার ও কিডনিতে গিয়ে সক্রিয় ভিটামিন ডি-তে পরিণত হয়, যা আরও শক্তিশালী। এই ভিটামিন শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, হাড় শক্ত রাখে, পেশির শক্তি বজায় রাখে এবং কিছু রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একে একটি ভিটামিন হলেও তার বৈচিত্র্যময় বিপাকীয় প্রভাবের কারণে এটি একটি হরমোন হিসেবে বিবেচিত হয়।
সূর্যের আলোয় থাকে অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, যা ভিটামিন ডি উৎপাদনে সহায়ক। তবে ত্বকে মেলানিনের উপস্থিতি বেশি থাকলে ভিটামিন ডি উৎপাদন কমে যায়। মেলানিন এক ধরনের প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে যা অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। এ কারণে কালো ত্বকে (ডার্ক স্কিন) সাদা ত্বকের তুলনায় ভিটামিন ডি কম উৎপাদিত হয়।
ভিটামিন ডি কীভাবে পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ১০ থেকে ৩০ মিনিট সারা শরীরে রোদ লাগালে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়া সম্ভব। তবে শরীর ঢেকে রাখা বা সানস্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ভিটামিন ডি উৎপাদন কমে যেতে পারে। শিশুরা এবং বৃদ্ধরা তুলনামূলক বেশি ভিটামিন ডি প্রয়োজন করে। অন্যান্যদের জন্য দৈনিক ৬০০ থেকে ৮০০ ইউনিট ভিটামিন ডি যথেষ্ট।
ভিটামিন ডি কম হলে কী হতে পারে রিকেট রোগের নাম অনেকেরই পরিচিত। এটি শিশুদের এক ধরনের হাড়ের রোগ, যেখানে তাদের হাত-পা বেঁকে যেতে পারে। এই রোগ ভিটামিন ডি অভাবে হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি অস্টিওম্যালেসিয়া নামে পরিচিত। এই রোগে হাত-পা এবং শরীরের হাড়ে ব্যথা হতে পারে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন ডি অভাব থাকলে অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ভঙ্গুরতা দেখা দিতে পারে, যেখানে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শুধুমাত্র হাড়ের সমস্যা নয়, বরং আরও জটিল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন হার্টের সমস্যা, বিভিন্ন প্রকারের ক্যানসার, মেটাবলিক সিনড্রোম, এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া। ভিটামিন ডি-এর অভাব সংক্রমণ এবং অটোইমিউন রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। গবেষণায় প্রমাণিত যে, যাঁদের ভিটামিন ডি-এর মাত্রা ঠিক ছিল, তাঁদের কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও জটিলতা কম হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. মো. ফিরোজ আমিন, বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা