শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন
শিশুর হাঁপানি শ্বাসতন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত একটি রোগ। শ্বাস, খাদ্য বা রক্তের মাধ্যমে আমাদের শরীরে কোনো অপ্রয়োজনীয় পদার্থ প্রবেশ করলে শরীর সাধারণত সেগুলো নিষ্ক্রিয় বা বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে কখনো কখনো এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা অস্বাভাবিক বা অতিরিক্ত হলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। এর একটি হলো হাঁপানি।
এই প্রদাহের ক্ষেত্রে যখন বাইরের অ্যালার্জেন শ্বাসতন্ত্রের সংস্পর্শে আসে, তখন সেখানে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়। এতে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং তা সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে, এবং শ্বাসনালির ভেতরে শোঁ-শোঁ শব্দ হতে পারে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে ‘হুইজ’ বলা হয়। এ কারণেই অনেক সময় ছোটদের শ্বাসকষ্টকে ‘হুইজি চাইল্ড’ বলা হয়ে থাকে। তবে হাঁপানি এবং হুইজি চাইল্ড সবসময় একই জিনিস নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রদাহ স্থায়ী হতে পারে। হাঁপানি রোগের পিছনে পরিবেশগত ও জিনগত উভয় ধরনের কারণ থাকতে পারে।
শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে শিশুদের হাঁপানির প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। এ সময় হাসপাতালে হাঁপানি আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। হাঁপানি প্রতিরোধে প্রথমেই যেসব অ্যালার্জেন বা উদ্দীপক শ্বাসতন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতা বাড়ায়, সেগুলো থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। যেমন পোষা প্রাণীর লোম, ধুলাবালি, তেলাপোকার উপস্থিতি, ফুলের রেণু, বায়ুদূষণ, তামাকের ধোঁয়া, পারফিউম, পরিষ্কার করার রাসায়নিক পদার্থ, আঁশযুক্ত খেলনা, কার্পেট, কুশন, ঠান্ডা আবহাওয়া, ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, অ্যাসপিরিন, বা বিটা ব্লকার জাতীয় ওষুধ ইত্যাদি।
ঠান্ডা বাতাস শ্বাসনালিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশু বাইরে গেলে নাক ও মুখ ঢেকে রাখার চেষ্টা করুন। তবে এটি করতে গিয়ে নাক-মুখ একেবারে আটকে দেওয়া যাবে না, এতে শিশুর শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। মাস্ক ব্যবহার করা নিরাপদ। শীতকালে শিশুরা যেন শুষ্ক ও ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘসময় খেলাধুলা না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
ঘরের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে। ঘর যেন অতিরিক্ত ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে, বা খুব শুষ্ক না হয়। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে রুম হিটার ব্যবহার করা যেতে পারে।
শীতকালে কম্বল ব্যবহারের পরিবর্তে কভারযুক্ত লেপ বা কমফোর্টার ব্যবহার করাই ভালো। কারণ কম্বলের সূক্ষ্ম আঁশ শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং এতে ধুলা জমে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।
শিশুদের প্যাসিভ স্মোকিং থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ঘরের চুলার ধোঁয়া, পরিবারের সদস্যদের ধূমপানের ধোঁয়া এবং মশার কয়েলের ধোঁয়া হাঁপানি আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিপজ্জনক।
হাঁপানি আক্রান্ত শিশুদের ফ্লু প্রতিরোধের টিকা দেওয়া উচিত। ফ্লু হলে তাদের শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশুকে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে, বিশেষত হাঁচি বা কাশির পরে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
যেসব খাবারে শিশুর অ্যালার্জি হতে পারে, সেগুলো খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস কেবলমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত। এরপর ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার দিতে হবে। কৌটার দুধ, গরু বা ছাগলের দুধ এবং প্যাকেটজাত খাবারে শিশুর অ্যালার্জি হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে কোন খাবারে অ্যালার্জি হচ্ছে তা শনাক্ত করা যায়।
হাঁপানি রোগের ধাপ অনুযায়ী আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। হাঁপানির শ্বাসকষ্ট কমাতে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ইনহেলার, নেবুলাইজার এবং প্রয়োজনে মুখে খাওয়ার ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। ইনহেলার-জাতীয় ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে হাঁপানির উপসর্গ কমানো যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার এবং স্পেসার সঠিকভাবে ব্যবহার শিখে নিতে হবে।
স্টেরয়েড ইনহেলার ব্যবহারের পর শিশুকে কুলি করানো প্রয়োজন। ইনহেলার এবং নেবুলাইজার নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। একই নেবুলাইজার একাধিক শিশু ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুবিশেষজ্ঞ ও শ্বাসতন্ত্র বিশেষজ্ঞের সমন্বিত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।