শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন
জীবনসঙ্গীর মৃত্যু ঘটলে, সেই শোক সামলানোর আগেই অনেকে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন কিংবা কিছু দিনের মধ্যে মৃত্যু বরণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, প্রিয়জন হারানোর শোকই এই অবস্থার প্রধান কারণ। কিন্তু, আসলেই কি শোক এবং শারীরিক অবস্থার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে? এ ধরনের ঘটনার কি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে?
প্রচলিত কথা হলো, সুস্থ মন সুস্থ দেহের বাসস্থান। দেহ সুস্থ না থাকলে মন ভালো থাকে না, আবার মন ভালো না থাকলে শারীরিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেতে পারে। দেহ ও মনের এই পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলালউদ্দীন আহমেদ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
যেকোনো মানসিক চাপ বা বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতার নিয়ন্ত্রণে বাধা হতে পারে। যেমন, একজনের যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। খাবারের নিয়ন্ত্রণ, শরীরচর্চা এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে তাঁর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত থাকে। মাঝেমধ্যে রক্তের সুগার লেভেল পরীক্ষা করাও জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু মানসিক বিপর্যয়ের কারণে সেই নির্দিষ্ট নিয়ম পালনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
তিনি হয়তো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় সময়মতো খাবার খাচ্ছেন না কিংবা এমন কিছু খাচ্ছেন যা তাঁর ডায়াবেটিসের জন্য ক্ষতিকর। ওষুধ ঠিকমতো সেবন করছেন না, অথবা শরীরচর্চায় অনিয়ম করছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। খাবার সময়মতো না খেলে সুগারের মাত্রা কমে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
ডায়াবেটিসের মতোই এমন পরিস্থিতি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, হাঁপানি, কিডনি রোগসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ক্ষেত্রেও ঘটে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে জীবনধারা নিয়ন্ত্রিত রাখতে হয়, এবং মানসিক বিপর্যয়ের সময় এসব রোগে জটিলতা বাড়তে পারে।
মন ভালো না থাকার কারণে ঘুমের সমস্যা হতে পারে, মানসিক চাপ সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রা বেড়ে শরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ মন খারাপ হলে শারীরিক অসুস্থতা বাড়ার ঝুঁকিও থাকে।
কেউ প্রিয়জন হারালে বা ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে, তাঁর আশেপাশের মানুষদের দায়িত্ব বাড়ে। প্রথম কয়েকদিন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি খাবারের যত্ন নেওয়া দরকার। তবে, তাঁকে যতদিন না স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন, ততদিন বিশেষভাবে দেহ-মনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। তিনি যদি আগে থেকেই কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন, তাহলে সেই অসুস্থতার চিকিৎসা যেন অবহেলায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
যেসব রোগের নিয়ন্ত্রণে জীবনধারার গুরুত্ব বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে সহায়তা করা প্রয়োজন। আগে থেকে কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও, তাঁর মানসিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত দুঃখবোধ বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। এমন কিছু শোক থাকে, যা হয়তো পুরোপুরি কাটানো সম্ভব নয়, তবে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারলে, সেই ব্যক্তির জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি হতে পারে।