সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:১২ পূর্বাহ্ন
স্ট্রোক মস্তিষ্কের একটি গুরুতর রোগ, যা মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জটিলতার সৃষ্টি করে। এতে হঠাৎ করেই মস্তিষ্কের কোনো একটি অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মস্তিষ্কের কোষগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়, অক্সিজেন ও শর্করার সরবরাহে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলেই তারা ধীরে ধীরে মারা যেতে থাকে। যদি মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট অংশে রক্ত প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় (আঘাতজনিত ছাড়া) এবং তা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, অথবা সেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন এই অবস্থাকে স্ট্রোক বলা হয়।

স্ট্রোকের ফলে প্যারালাইসিস (পক্ষাঘাত) এর মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে, এবং কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রোকের কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। স্ট্রোকের পর শরীরের একটি দিকের হাত-পা এবং মুখমণ্ডল প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কের যে অংশগুলো শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, সেসব অংশ স্ট্রোকে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কার্যকারিতা হারায়। স্ট্রোকের প্রকৃতি ও তার তীব্রতার উপর নির্ভর করে প্যারালাইসিসের ধরন ও মাত্রা নির্ধারিত হয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ:
স্ট্রোকের লক্ষণ ও উপসর্গ সহজে শনাক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী ‘বি ফাস্ট’ নামক একটি সহজ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
বি অর্থ ব্যালেন্স বা ভারসাম্য— হঠাৎ ভারসাম্যহীনতা।
ই অর্থ আই বা দৃষ্টি— হঠাৎ দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা।
এফ অর্থ ফেস বা মুখমণ্ডল— হঠাৎ মুখের একপাশ ঢলে পড়া।
এ অর্থ আর্ম বা বাহু— হঠাৎ এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া।
এস অর্থ স্পিচ— হঠাৎ করে কথা জড়িয়ে যাওয়া।
টি অর্থ টাইম বা সময়— এসব লক্ষণ দেখা মাত্রই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
স্ট্রোকের প্রকারভেদ:
মস্তিষ্কে আঘাতের ধরন অনুসারে স্ট্রোককে প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়।
ইসকেমিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া, কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে, বিশেষ করে হৃদপিণ্ড থেকে জমাট রক্ত এসে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে যে স্ট্রোক হয়, তা ইসকেমিক স্ট্রোক নামে পরিচিত। এতে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তবে সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং অনেকেই স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচেন।
হেমোরেজিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে রক্ত মস্তিষ্কের ভেতর ছড়িয়ে পড়লে তাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়। এই ধরনের স্ট্রোকের লক্ষণ নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর উচ্চ রক্তচাপ থাকে এবং তাঁরা অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। এ ধরনের স্ট্রোকে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। যারা প্রাথমিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাঁদের দ্বিতীয়বার রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা কম থাকে। স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম।
স্ট্রোকের চিকিৎসা:
স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার পদ্ধতি আলাদা হয়। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো লক্ষণগুলো দেখে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। স্ট্রোক চিকিৎসার মূল দিক হলো নার্সিং এবং ধারাবাহিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা।
ইসকেমিক স্ট্রোকে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছালে থ্রম্বোলাইসিস (ইনজেকশনের মাধ্যমে জমাটবদ্ধ রক্ত তরল করা) এবং থ্রমবেকটমি (স্টেন্ট ব্যবহার করে জমাটবদ্ধ রক্ত অপসারণ) করা সম্ভব। অন্যান্য ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা দেখে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা দেন অথবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নির্দেশনা দেন।
হেমোরেজিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে, প্রাথমিক চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে সার্জারি, সার্জিক্যাল ক্লিপিং বা কয়েলিং করেও চিকিৎসা করা যায়। তবে এই চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, স্ট্রোকের ধরন, এবং কত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো গেছে তার ওপর।
এছাড়া কিছু বিশেষ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। শ্বাস নিতে সমস্যা হলে মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে হবে। বমি হলে রোগীর মাথা এক দিকে কাত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো খাবার বা পানি খাওয়ানো যাবে না। অজ্ঞান রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসনালী, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং রক্তপ্রবাহের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। রোগীকে কাত করে শুইয়ে রাখতে হবে। চোখ ও মূত্রথলির যত্ন নিতে হবে, প্রয়োজনে ক্যাথেটার ব্যবহার করতে হতে পারে। রোগীর সঙ্গে কমপক্ষে দুজন সাহায্যকারীকে হাসপাতালে যাওয়া উচিত, যাতে চিকিৎসা দ্রুততার সাথে করা সম্ভব হয়।
স্ট্রোকের কারণ:
বয়স ৫৫ বছরের বেশি হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। পুরুষদের মধ্যে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ওজনাধিক্য থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। যদি পরিবারের কারও স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকে, ধূমপান বা অ্যালকোহল পানের অভ্যাস থাকে, হৃদপিণ্ডের সমস্যা, যেমন নাড়ির অস্বাভাবিক স্পন্দন বা হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, হরমোন থেরাপি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ সেবন করেন, অথবা পূর্বে স্ট্রোক বা টিআইএ (ট্রানজিট ইসকেমিক অ্যাটাক) হয়ে থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
প্রতিরোধের উপায়:
স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা এবং সুস্থ জীবনযাপন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক সময়ে সঠিক খাবার খাওয়া, এবং নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে তা নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম করা বা হাঁটা, কিংবা সম্ভব হলে হালকা দৌড়ানো। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেন তা অতিরিক্ত না বাড়ে। শাকসবজি, ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি, দুধ, এবং আঁশযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
*ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী: ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল