মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ ক্রমশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পনে কেঁপে উঠেছে দেশ, যা বড় ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বাভাস হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস না থাকায় মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত ১০ দিনে দেশের অভ্যন্তরে বা আশপাশে চারবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে, যা বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গতকাল বুধবার সকাল ১১টা ৩৬ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৬, যার উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুর রাজ্যের ইম্ফল এলাকার ইয়ারিপক অঞ্চলে। ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার, যা তুলনামূলকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ায়। যদিও কোনো বড় ধরনের ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে নাগরিকদের মধ্যে।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. রুবায়েত কবীর জানান, উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার দূরত্ব ছিল ৪৪৯ কিলোমিটার। কম্পন গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুভূত হয়েছে। গত ১০ দিনে এটি চতুর্থ ভূমিকম্প, যা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ভূমিকম্প আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র মনে হলেও ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৭ সালে দেশে ২৮টি ভূমিকম্প হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৪১টি এবং ২০২৪ সালে রেকর্ড ৫৩টি ভূমিকম্প হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদরা সতর্ক করে বলছেন, এ প্রবণতা অগ্রাহ্য করলে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলছেন, ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্পের মাধ্যমে শক্তি নির্গত হলেও বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার যে গাণিতিক চক্র, সেটি পূর্ণ হতে চলেছে। ঢাকায় যদি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে, যা ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এবং ঢাকাকে বিশ্বের ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ শহরের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংঘর্ষ এবং শক্তির সঞ্চয় এই ভূমিকম্পের মূল কারণ। ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ছোট ভূমিকম্পের প্রবণতা বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। আমাদের দ্রুত ভূমিকম্পকালীন সতর্কতা এবং প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত মহড়া শুরু করা উচিত।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) অনুযায়ী, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশে ৬ কোটি ১২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত শক্তি জমা হয়েছে, যা দেশের জনবহুল শহরগুলোতে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি এখনো কেবল উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নাগরিক সচেতনতা, নিয়মিত মহড়া ও দুর্যোগ মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়।