বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ন
এক চিরকুটে ভেঙে পড়লো গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মুখোশ!
অনলাইন ডেস্ক
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আজ ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও আলোড়ন তোলা ঘটনা, যা দেশজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ধ্রুবজিৎ কর্মকার (২২) আত্মহত্যা করেছেন নিজের হোস্টেল রুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় গামছা পেঁচিয়ে। চিরকুটে লেখা তাঁর শেষ বার্তায় স্পষ্ট ভাষায় দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন এই তরুণ।
ঘটনাটি ঘটেছে রোববার দুপুরে কলেজের অমর একুশে হলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে। ধ্রুবজিতের চিরকুটে লেখা ছিল, “সরি মা, বাবা। আমি ধ্রুবজিৎ, সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ব্যাংকের কার্ডের টাকাগুলো মাকে দিয়ে দিও। আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। পরের বার ফার্মেসি নিয়ে পড়ব। এত চাপ আমার পক্ষে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। বিদায়। হরে কৃষ্ণ।” এমন মর্মস্পর্শী বার্তার পর যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা ক্যাম্পাস।
ধ্রুবজিতের বাড়ি ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার বিজয়পুর গ্রামে। বাবা মনোতোষ কর্মকার এবং মা সুপ্তা কর্মকারের আদরের এই সন্তান পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী, কিন্তু কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যে মানসিক চাপের বলি হতে পারেন, তা ভাবেননি কেউ।
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, রোববার দুপুরে পরীক্ষা চলাকালে ধ্রুবজিৎ নকলসহ ধরা পড়েন। কর্তব্যরত শিক্ষকরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর খাতা কেড়ে নেন এবং তাঁকে পরীক্ষাকক্ষ থেকে বের করে দেন। এই ঘটনাটি ধ্রুবজিতের মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, সে সরাসরি হোস্টেলের রুমে ফিরে গিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
হোস্টেল রুমে দীর্ঘসময় ধ্রুবজিৎকে দেখতে না পেয়ে সহপাঠীরা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে দরজা ভেঙে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরিদর্শক সজীব কুমার বাড়ৈ জানান, আত্মহত্যার ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
এই ঘটনা যেন আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কী ভয়ানক মানসিক চাপ ও প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। ধ্রুবজিতের মতো একজন তরুণ, যে হয়তো জীবনের বহু স্বপ্ন বুকে লালন করছিল, আজ আমাদের অমানবিক, নম্বরনির্ভর, এবং অসম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার বলি হয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিল।
একের পর এক এমন মৃত্যু আমাদের সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য করবে কিনা, তা ভবিষ্যত বলবে। তবে আজকের এই মৃত্যু আর পাঁচটা আত্মহত্যা নয়—এটা এক সরব প্রতিবাদ, এক অদৃশ্য চিৎকার, যা দেশের শিক্ষানীতির গভীর সংকটকে নগ্ন করে দিয়েছে।