বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন
প্রথম সন্তানের জন্মেই মৃত্যু—কোথায় ছিল চিকিৎসক-নার্স?
জাহিদ হাসান – জামালপুর জেলা প্রতিনিধি
জামালপুরে চিকিৎসা অবহেলার এক বেদনাদায়ক ও ক্ষোভজাগানিয়া ঘটনায় প্রাণ হারালেন মাত্র ২১ বছরের এক তরুণী মা, যিনি জীবনের প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার আনন্দের বদলে পেলেন মৃত্যু। সোমবার সকালে সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের “দুবাই হাসপাতাল বিডি” নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ঘটে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, যা স্থানীয়ভাবে চরম উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বহীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা রনি মিয়া গতকাল রবিবার সকালে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রিতুকে ভর্তি করেন দুবাই হাসপাতাল বিডিতে। বিকেলের দিকে রিতুর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পরিবারে খুশির আবহ, নতুন প্রাণের আগমনে আনন্দের জোয়ার—সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায় রাত নামতেই। কারণ, প্রসবের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রিতুর খিচুনি শুরু হয়, তার অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি তখনই প্রকাশ পায়—হাসপাতালটি কার্যত ছিল ফাঁকা! কোনও চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, এমনকি আর কোনও রোগীও নয়; যেন সেটি একটি পরিত্যক্ত ভবনে রূপ নিয়েছিল।
রিতুর বড় ভাই লাবলু মন্ডল বলেন, “সারারাত আমার বোন খিচুনির যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, অথচ একটি মানুষও পাশে দাঁড়ায়নি। ডাক্তার-নার্স কেউ নেই, শুধু মৃত্যু অপেক্ষা করছিল।” অবশেষে সোমবার সকালে রিতুর মৃত্যু হয়। সকালে এক হাসপাতাল কর্মচারী এসে শুধু মৃত্যুর খবর দিয়ে পালিয়ে যায়।
এই নির্মম ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গা-ঢাকা দিয়েছে। স্বজনদের দাবি, এটি সরাসরি চিকিৎসা অবহেলা, আর এমন দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালটি নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছিল কিনা, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঘটনার খবর পেয়ে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. স্বাগত সাহা সরেজমিনে ক্লিনিকটি পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, “হাসপাতালটিতে গিয়ে মালিকপক্ষের একজন ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে নারায়ণপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আ. স. ম. আতিকুর রহমান জানান, পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছে এবং অভিযোগ না থাকায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
এই ঘটনায় রিতুর পরিবার শুধু একজন স্বজন নয়, হারিয়েছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, এক নবমাতৃত্বের সম্ভাবনা। একটি নবজাতক আজ মায়ের কোলে নয়, শূন্যতা নিয়ে বড় হবে—এই বাস্তবতাই যেন চিকিৎসা ব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর চেহারা প্রকাশ করে। বেসরকারি ক্লিনিকের বেহাল অবস্থান, লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম এবং অনিয়ন্ত্রিত সেবার বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এই মৃত্যু যেন শুধু রিতুর না হয়, বরং এক করাল সতর্কবার্তা হয়ে উঠে সবার জন্য—জনগণের জীবনের সঙ্গে আর যেন কেউ এমন নির্লজ্জ খেলায় মেতে না ওঠে।