শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো বড়দিন, যা ক্রিসমাস ডে নামে পরিচিত। ২৫ ডিসেম্বর দিনটি খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা মনে করেন এই দিনে তাদের ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিষ্ট পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়।
পবিত্র বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার বছর আগে ঈশ্বরের পরিকল্পনায় মাতা মেরি (বিবি মরিয়ম) যিশুকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। মেরি ছিলেন ইসরাইলের নাজারেথ শহরের এক সৎ এবং ধর্মপ্রাণ কাঠমিস্ত্রি যোসেফের সঙ্গে বাগদান সম্পন্ন করেছিলেন। একদিন এক ফেরেস্তা এসে মেরিকে জানান যে তিনি ঈশ্বরের পুত্রকে জন্ম দিতে যাচ্ছেন। ফেরেস্তা শিশুটির নাম যিশু রাখার নির্দেশ দেন। তবে এই খবর শুনে মেরি প্রথমে উদ্বিগ্ন হন। তিনি বলেন, ‘স্বামীর শারীরিক সংস্পর্শ ছাড়া সন্তান ধারণ কীভাবে সম্ভব?’
ফেরেস্তা মেরিকে আশ্বস্ত করেন এবং জানান, ঈশ্বরের পবিত্র আত্মা তার উপর প্রভাব বিস্তার করবে, এবং এভাবেই তিনি গর্ভবতী হবেন। মেরি এ কথা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করলেও জানতেন, কুমারী অবস্থায় সন্তান ধারণের কারণে ইহুদিদের নিয়ম অনুযায়ী তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
যোসেফ যখন বুঝতে পারেন মেরি গর্ভবতী, তখন তিনি তাকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু একটি স্বপ্নে ঈশ্বরের দূত তাকে বলেন, মেরির গর্ভধারণ পবিত্র আত্মার প্রভাবেই হয়েছে এবং এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা। এই কথায় বিশ্বাস করে যোসেফ মেরিকে বিয়ে করেন এবং সন্তান জন্ম পর্যন্ত মেরির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকেন।
সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে রোমান সম্রাট অগাস্টাস আদমশুমারীর নির্দেশ দেন, যাতে সবাই তাদের পূর্বপুরুষের শহরে গিয়ে নাম নিবন্ধন করেন। যোসেফ তার পূর্বপুরুষদের শহর বেথলেহেমে মেরিকে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে প্রচুর মানুষের ভিড় থাকায় তারা কোনো আবাসস্থল পাননি। বাধ্য হয়ে তারা একটি গোয়ালঘরে রাত কাটান, আর সেখানেই মেরি যিশুকে জন্ম দেন। যিশুকে কাপড়ে মুড়িয়ে পশুর খাবারের পাত্রে রাখা হয়। যোসেফ শিশুটির নাম রাখেন যিশু, যেমনটা ফেরেস্তা নির্দেশ দিয়েছিলেন।
যিশুর জন্মের সময় অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটে। মাঠে ভেড়া চরানো রাখালদের কাছে ফেরেস্তা যিশুর জন্মের সুসংবাদ দেন। তারা ছুটে গিয়ে যিশুকে দেখে আসেন এবং উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন একটি ভেড়ার বাচ্চা।
ততক্ষণে আকাশে একটি উজ্জ্বল তারা দেখা যায়। জ্যোতির্বিদ এবং পণ্ডিতরা তারাটি দেখে বুঝতে পারেন এক বিশেষ শিশুর জন্ম হয়েছে। তারা অনুসন্ধান করে যিশুর কাছে পৌঁছান এবং স্বর্ণ ও সুগন্ধি দ্রব্য উপহার দেন।
এইভাবে যিশু বড় হয়ে ওঠেন এবং মানুষের মাঝে মুক্তির বাণী প্রচার করেন। তিনি অনেক অলৌকিক কাজ করেন। উদাহরণস্বরূপ, পানিকে আঙ্গুরের রসে রূপান্তর এবং মৃত ব্যক্তিকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কাজ বাইবেলে বর্ণিত রয়েছে।
তবে যিশুর শিক্ষা ইহুদি ধর্মগুরুদের বিরাগভাজন করে এবং তারা রোমান শাসকদের কাছে তাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ক্রুশে বিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেন। বাইবেলের মতে, এটি ঈশ্বরেরই পরিকল্পনা ছিল। মৃত্যুর তিনদিন পর যিশু পুনরুত্থান করেন এবং স্বর্গে ফিরে যান।
যিশুর শিক্ষা ও অলৌকিক কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার অনুসারীরা খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচিত হন। বর্তমানে খ্রিষ্ট ধর্ম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্ম।
যদিও যিশুর জন্ম প্রায় দুই হাজার বছর আগে, বড়দিন উদযাপন শুরু হয় পরে। প্রথমদিকে যিশুর শিষ্যরা তার জন্মদিন কোনো উৎসব হিসেবে পালন করতেন না। দ্বিতীয় শতাব্দীতে ইরেনাউস এবং তার্তুলিয়ান নামের দুই ধর্মগুরু বড়দিনকে খ্রিষ্টান উৎসবের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
২০০ খ্রিষ্টাব্দে মিসরে প্রথম বড়দিন পালনের তথ্য পাওয়া যায়। গ্রিক লেখক লুসিয়ান ক্রিসমাস উদযাপনের উল্লেখ করেছেন। ২২১ খ্রিষ্টাব্দে মিসরের একটি দিনপঞ্জিতে মেরির গর্ভধারণের তারিখ ২৫ মার্চ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে হিসাব করে ২৫ ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন নির্ধারণ করা হয়।
৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমে বড় আকারে বড়দিন উদযাপন শুরু হয়। ৩৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমান পঞ্জিকায় যিশুর জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয় এবং পরে পোপ এটি স্বীকৃতি দেন।
মধ্যযুগে বড়দিন আরও জনপ্রিয় হয়। ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির রাজা এই দিনে রোমান সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট স্টিফেন হাঙ্গেরিকে খ্রিষ্টান রাজ্য ঘোষণা করেন। তবে ১৬৪৭ সালে ইংল্যান্ডে একদল গোঁড়া শাসক উৎসবটি নিষিদ্ধ করেন। নিষেধাজ্ঞা উঠলে এটি আবার সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।
ভারতবর্ষে ১৬৬৮ সালে প্রথম ক্রিসমাস উদযাপন হয়। কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্ণক সুতানুটিতে প্রথম বড়দিন পালন করেন।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালিত হয়। তবে রাশিয়া, আর্মেনিয়া এবং মিসরের মতো কিছু দেশে এটি পালিত হয় ৭ জানুয়ারি।
বড়দিন আজ একটি সার্বজনীন উৎসব। যিশু খ্রিষ্ট মানুষকে দেখিয়েছিলেন মুক্তি ও কল্যাণের পথ। তাই বড়দিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে খ্রিষ্টানরা দিনটি আনন্দ এবং মুক্তির প্রতীক হিসেবে উদযাপন করে।