বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন
আজ বাংলাদেশের অভিনয় জগতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। ৬০ বছর বয়সে তার হঠাৎ প্রস্থান যেন ঢালিউডের আকাশে এক বিশাল শূন্যতার ছায়া ফেলে। একাধারে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র— তিন মাধ্যমেই নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। ‘হোক সে ব্যক্তিজীবন কিংবা ক্যামেরার সামনের রঙিন জীবন’— সবখানেই তিনি ছিলেন নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী।
১৯৫২ সালের ২৯ মে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের চুয়ারিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ফরীদি ছিলেন জন্মগতভাবেই এক অনন্য মেধাবী। বাবা এটিএম নূরুল ইসলাম ও মা বেগম ফরিদা ইসলামের আদরের সন্তান হলেও তার শৈশব থেকেই ছিল ভিন্নতার ছাপ। ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক শেষে চাঁদপুর সরকারি কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও, মুক্তিযুদ্ধের আহ্বানে জীবন বদলে যায়। দেশের জন্য অস্ত্র তুলে নেওয়া এই মানুষটি পরে ফিরে যান পড়াশোনায়, অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু তার সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল অভিনয়, যা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য উৎসব দিয়ে।
ঢাকা থিয়েটারের হাত ধরে ৮০’র দশকে টেলিভিশন নাটকে প্রবেশ করেন তিনি, এরপর যা ইতিহাস। ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় তাকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ২৫০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপে হাজির করেছেন— কখনো নায়ক, কখনো ভয়ংকর ভিলেন, আবার কখনো প্রাণখোলা কমেডিয়ান। প্রতিটি চরিত্রই তার হাতে পেয়েছে নতুন মাত্রা।
তার অবদানের স্বীকৃতিতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও নাট্যাঙ্গনে অবদানের জন্য তাকে বিশেষ সম্মাননা দেয়। ব্যক্তিজীবনে ফরীদি দুইবার বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী ছিলেন শারারাত ইসলাম, যাঁদের ঘরে রয়েছে কন্যা দেবযানী। পরে তিনি বিয়ে করেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে, তবে ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়।
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর এক দুর্ঘটনায় বাথরুমে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবন কেড়ে নেয়।
হুমায়ুন ফরীদি আজ নেই, কিন্তু তার অমর চরিত্রগুলো বাঙালির মনে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ‘নায়ক কিংবা ভিলেন’— যেই চরিত্রেই থাকুন, তিনি ছিলেন একমাত্র ফরীদি, যাঁর জায়গা কেউ কোনোদিন নিতে পারবে না।