রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন
“বাসা-প্রেম, যুদ্ধবিরতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যত—তেহরানের ফিরতি পথে মানুষের মিশ্র অনুভূতি”
অনলাইন ডেস্ক
ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের ভয়াবহ সংঘাত শেষে, তেহরানবাসী ধীরে ধীরে শহরে ফিরে আসছে—তবে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি যেন সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তাদের। বিমল করের উপন্যাস ‘ছুটি’-র সেই অমল-ভ্রমরের মতো, এই ফিরতি পথও ভরা কিছুটা আনন্দ, কিছুটা টানাপোড়নের সাথে।
ছবির সেই ক্লোজ–আপ দিকচিত্র মনে করিয়ে দেয় শত শত পরিবার, যারা এক সময়ে নিরুদ্দেশ হযেছিল ভয়, উন্মত্ততা আর অদৃশ্য ভবিষ্যতের ঝুঁকিতে। যুদ্ধের আগের দিনগুলোতে তেহরানের রাস্তা ছিল গাড়ির সারি, আতঙ্কে পদাতিক ঘোরা—এখন আবার দেখা যাচ্ছে স্যুটকেসবাহী পরিবার, গাড়ি, ফিরতি শব্দের কোলাহল। তবে ফিরে আসা মানে স্বস্তি নয়, বরং নীরব, চাপা একটা কষ্ট—যেখানে চোখে ভাসে হারানোর স্মৃতি, রাতগুলোয় অনিদ্রার অন্ধকার।
তেহরানে গনবিধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন এখনও স্পষ্ট—ভাঙা জানালা, বেঁকে যাওয়া দরজা, ছিন্ন ভিন্ন দেয়াল। আল–জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে ৬১০ জন, আহত হয়েছে প্রায় ১,৪৮১—যাদের ৯০ শতাংশই বেসামরিক। শহরের ধারণতাকে বিস্মৃত মিশিয়ে দিয়েছিল বিস্ফোরণ, এখন ফেরাকালে এ স্মৃতিগুলো ঘুরে ঘুরে জাগিয়ে দেয় নতুন প্রশ্ন: কীভাবে আবার ৩০ লাখ মানুষের শহরকে আগের মতো ফিরিয়ে আনা যায়?
নূতন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে, ঢুকছে ইন্টারনেট, ফের চলছে অফিস। কিন্তু বাণিজ্য এখনো কাঁপছে। “গ্রাহক এসেছে, কিন্তু ব্যবসায় গতি নেই,” জানান দুগ্ধপণ্যের দোকানদার মরতেজা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাবা বলেছেন—“বোমা প্রতিরক্ষার আওয়াজে রাতগুলো তুল্য অন্ধকার”—এখন সেই সময়ের স্মৃতি ঘুরে ফিরে আসে, কথা বলে নির্দিষ্ট স্বপ্নগুলো ফিরবে কিনা।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধের অন্ধকারে প্রতিটি ঘরে যাতে আলো না হয়, সেই ভয় সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছে। সহমর্মিতার সেই এক অভিজ্ঞতা গড়ে উঠছে—পড়শি পুত্রের জন্য খাবার এনে দেওয়া, রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা, পথের কুকুর-বেড়ালের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা। এ যেন যুদ্ধ-পরবর্তী তারকসম্বলিত এক ‘ক্লোস-নিট কমিউনিটি’—যেখানে মানুষ একসাথে ‘বেঁচে থাকার’ শক্তি খুঁজে নিয়েছে।
তবে ফিরে আসা মানেই কি আর নিরাপদ জীবন? মনে করে জীবনের রিকশার মতো আবার সেই ‘আতঙ্কের গোলা’ ফিরবে। তেহরানের রাজনীতিবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হামেদ জানাচ্ছেন—“এটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো, যা বারবার ফিরে আসছে।” ইরান ও ইসরায়েল একে অপরকে লঙ্ঘনের অভিযোগ জানিয়ে, যুদ্ধবিরতির পরও একে অন্যকে তাড়িয়ে খেলে… ফলে ফিরতি কালচার যখন নির্মিত হচ্ছে, তখন এর ভিত্তিতেই সঙ্কটের উঁচু দেয়ালও দিন দিন প্রকাশ পাচ্ছে।
তেহরানে বাস ফিরে এসেছে, অফিস খুলেছে, রেস্তোরাঁ-রাস্তায় জীবনসংগীত তুলছে। কেউ ব্যক্তি জীবনে ফিরে এসেছে, কেউ আবার বোমার বেদনায় বাবা-মা–স্বজন হারানো স্মৃতি মাথায় নিয়ে। এ যেন এক রূপান্তর—যেখানে একদিকে ক্ষয়, অন্যদিকে নতুন বন্ধুত্বের শুরু। “তেহরান শুধু শাসন চরিত্র নয়, আমাদের কাছে এটি ‘জীবন্ত শহর’ হয়ে উঠেছে,” টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন বিশ্লেষক সিয়ামাক ঘাসেমি।
এ পরিস্থিতিতে ফিরতি পথটি শাসনের পুনর্নির্মাণ নয়, বরং মানুষের জীবনকেন্দ্রিক পুনর্গठन—যেখানে সদ্য ফিরতি বাড়িগুলোয় বসে থাকা মানুষগুলো আবারও স্বপ্ন বুনছেন, সাথে নিয়ে সত্যিকারের মানুষিক ভাঙন ছুঁয়ে থাকা এক আশার সঞ্চার।
সূত্র: আল–জাজিরা ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আমাদের সামনে এনে দিয়েছে যুদ্ধৌদ্ধদের ‘ছুটি’র মতো জীবনের গল্প—যেখানে ফিরে আসা মানে শুধু স্থান নয়, বরং একজন মানুষ নতুনভাবে জীবনের সংগীত আবিষ্কার করছে।