বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩০ অপরাহ্ন
সরকারের দুর্বল মুহূর্তে দাবির স্রোতে ভাসছে ঢাকা
অনলাইন ডেস্ক
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘদিনের বৈষম্য আর জমে থাকা ক্ষোভ যেন এক স্রোতে বিস্ফোরিত হয়। কেউ যৌক্তিক, কেউ অযৌক্তিক নানা দাবি নিয়ে নেমে পড়ে রাজপথে। এক বছরের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা রূপ নেয় যেন ‘দাবি আদায়ের নগরীতে’। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা, সচিবালয়, শাহবাগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে ওঠে দাবিদাওয়ার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এসব কেন্দ্রের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে, মুহূর্তে মুহূর্তে স্থবির হয়ে পড়ে নগরজীবন।
পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে শুধু রাজধানীতেই হয়েছে চার শতাধিক আন্দোলন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হিসাবে, গড়ে প্রতিদিন দুই বা ততোধিক কর্মসূচি পালিত হয়। এসব সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েক দফা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যমুনা ও সচিবালয় এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথম বিজ্ঞপ্তি আসে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট, এরপর চলতি বছরের ১৩ মার্চ, ১০ ও ২৬ মে, ৮ জুলাই এবং সর্বশেষ গত বুধবার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার গঠনের শুরুতে ক্ষমতার ভিত দুর্বল থাকে, সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণও থাকে না। তখন জমে থাকা ক্ষোভ ও নানা দাবি বিস্ফোরিত হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষ তখন সুযোগ বুঝে বেপরোয়া হয়ে ওঠে নিজের স্বার্থ আদায়ে। শুরুতে সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার প্রবণতা এই ঢেউকে আরও উসকে দেয়, যা শেষমেশ জনদুর্ভোগ ডেকে আনে।
ঘটনার ক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিতেই বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন, ওয়াসা, ডেসা, সচিবালয় ও বিভিন্ন আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মসূচি শুরু করেন। একই সময়ে আন্দোলনের মুখে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা ছয়টি বিষয়ে পরীক্ষা বাতিল করে কাঙ্ক্ষিত ফল আদায় করে নেয়। ২০ আগস্ট সচিবালয়ে ঢুকে শিক্ষা উপদেষ্টাকে ঘেরাও করেও দাবি পূরণে সফল হয় তারা।
রাজধানীতে এই সময় ঘটে একের পর এক আন্দোলন— আনসার থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যদের পুনর্বহাল দাবি, নিয়োগ বঞ্চিত বিসিএস ক্যাডারদের আন্দোলন, পিলখানা ঘটনার পর চাকরিচ্যুত সাবেক বিডিআর সদস্যদের দাবিদাওয়া, সাত কলেজ পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার আন্দোলন, পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের অবরোধ, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধি, রেলসেবা বন্ধ করে কর্মচারীদের আন্দোলন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কোর্সকে স্নাতক স্বীকৃতির আন্দোলন এবং ৭০% আবাসন ভাতাসহ তিন দফা দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।
এ ছাড়া ইশরাক হোসেনের অনুসারীদের ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে দাবির বিক্ষোভ, ছাত্রদল নেতা সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগ থানা ঘেরাও, শিক্ষকতার চাকরি জাতীয়করণের দাবি, বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন, হাইকোর্টের মাজার গেটে বিক্ষোভ, পলিটেকনিক ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দূরীকরণের দাবিও রাজধানীর রাস্তায় উত্তাপ ছড়ায়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে যখন মানুষ বুঝে যায় আইনকানুন কার্যকর নয়, তখন সবাই সুযোগ নেয়। বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর সরকারের দুর্বল মুহূর্তে সুযোগসন্ধানীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি— সরকার যখন পরিস্থিতি বুঝতে শুরু করেছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ততক্ষণে ঢাকা পরিণত হয়েছে ‘দাবি আদায়ের শহরে’।