মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৩ পূর্বাহ্ন
আহলান সাহলান মাহে রমজান
এ, কে, এম বদরুল আলম মাহমুদ
সকলকে রমজানুল মোবারকের আন্তরিক শুভেচ্ছা। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য রমজান মাস শুধুমাত্র সিয়াম সাধনার নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের মাস। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন প্রতিটি সক্ষম মুসলমানের ওপর ৩০টি রোজা ফরজ করেছেন, আর এই মহান মাসকে যথাযথভাবে পালন করতে আমাদের প্রস্তুতিও থাকে যথেষ্ট। কিন্তু এক নির্মম বাস্তবতা হলো, রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে!
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই অশুভ প্রতিযোগিতা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে খেজুর, ফলমূল, মাছ-মাংসসহ রমজানে ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে বেড়ে যায়। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি থামানো যায় না। তারা পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, যা এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক অন্যায়।
এই চক্রান্তের প্রধান শিকার হয় সাধারণ মানুষ। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা দুঃসহ হয়ে ওঠে। ফলে জনগণের মাঝে চরম হতাশা এবং সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সরকার মাঝে মাঝে মনিটরিং চালালেও, শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কার্যকর ফল লাভ করা যায় না, যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।
এ সমস্যা মোকাবিলায় বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কঠোর ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আইন, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি যৌথ সেল গঠন করা উচিত, যা বাজার পর্যবেক্ষণ করবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি, বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
“এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) জানিয়েছে, গত অর্থবছরে (অর্থবছর ২৪) দেশে সয়াবিনের উৎপাদন ছিল ১.৭২ লাখ মেট্রিক টন, সূর্যমুখী ২৭,০০০ মেট্রিক টন ও সরিষা ১৬.৭ লাখ মেট্রিক টন।
আমদানি বৃদ্ধি ও দাম নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলু ও খেজুরসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর শুল্ক মওকুফ করেছে। এছাড়াও, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কমে যাওয়ার ফলে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশন (বিটিটিসি) থেকে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে- যা এক মাস আগে প্রতি টন ৯৮৯ ডলার ছিল। প্রতি কেজি অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ১১৬.৭৫ টাকা।
এছাড়াও, পরিশোধিত পাম তেলের আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতি টন ১,০৭২.৫০ ডলার কমেছে- যা এক মাস আগে প্রতি টন ১,১৬৭.৫০ ডলার ছিল। বাংলাদেশে প্রতি কেজি পরিশোধিত পাম তেলের দাম ১২৬.১৮ টাকা।
রমজান মাস শুরুর আগে দেশে প্রধান খাদ্যশস্য ও পণ্য যেমন চাল, গম, চিনি, ছোলা, খেজুর, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, লবণ ও আলুর মজুত ও দাম এখন বিবেচনাধীন রয়েছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, এ বছর আলু উৎপাদন হয়েছে মোট ১.৩০ কোটি টন- যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১.১৩ কোটি টন। তিনি আরও বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষক পর্যায়ে আলু এখন প্রতি কেজি ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে- যা খুচরা পর্যায়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি।’
এছাড়াও, ডিমের বাজার এখন স্থিতিশীল, অন্যদিকে কাঁচা বাজারে শীতকালীন সবজির দাম ও সরবরাহ ঠিক আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী বাজার পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কারণে নির্বিঘ্ন সরবরাহ শৃঙ্খলে ভোক্তারা তাদের সন্তুষ্টি ও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
প্রধান খাদ্যশস্যের মজুত: চাল: ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, চালের বর্তমান মজুত ১৩.১৭ লাখ মেট্রিক টন। গম: গমের বর্তমান মজুত ৩.৪২ লাখ টন।”
(সূত্র: বাসস, তারিখ: ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)
এরপরও রমজান আসলে দাম বেড়ে যাবে ও ক্রেতারা অসহায় হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হবে।
সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও এই বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব। একইসঙ্গে, ভোক্তাদেরও প্রয়োজনীয় তথ্য জানিয়ে দেওয়া দরকার, যেন তারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন।
দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একমাত্র প্রত্যাশা হলো—বাজার স্থিতিশীল রাখা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ করা। সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতা রোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে, জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাই এখনই সময়, সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার এবং জনস্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও সুসংগঠিত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার।